
সরকারি দপ্তরগুলোর কাজ নিয়মিত পান তিনি। তবে কার্যাদেশ পাওয়ার পর নিজে ইটের একটা খোয়াও ফেলেন না। অন্য ঠিকাদারদের কাছে প্রকল্প বিক্রি করে দেন। এভাবে প্রকল্প হাতবদল করেই আয় করেন কোটি কোটি টাকা।
এই ব্যক্তির নাম জামাল আহমদ চৌধুরী। তিনি আক্তার ট্রেডার্সের পরিচালক। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় সিলেট নগরের আম্বরখানা এলাকায়। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে তিন বছরে আক্তার ট্রেডার্সের নামে পাওয়া ২৩টি প্রকল্প বিক্রির তথ্য মিলেছে। এর মাধ্যমে প্রায় ২০ কোটি টাকা বাগিয়ে নিয়েছেন জামাল আহমদ।
এদিকে সরকার সম্প্রতি দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান শুরু করে। এরপর জামাল আহমদ তাঁর কাছ থেকে প্রকল্প কেনা ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। ওই ঠিকাদারেরা পড়েছেন চরম বেকায়দায়। প্রকল্পের কাজ তাঁরা নিজ খরচেই করছেন। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী বিল পাচ্ছেন না। কারণ, বিল জমা হচ্ছে আক্তার ট্রেডার্সের ব্যাংক হিসাবে। এ অবস্থায় জামাল আহমদের বিরুদ্ধে চারটি প্রতারণার মামলা করেছেন চারজন ঠিকাদার। এসব মামলায় তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন।
প্রকল্প কেনা ঠিকাদারেরা বলছেন, সবই জামাল আহমদের কারসাজি। কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর যোগসাজশ রয়েছে। ফলে দরপত্রে অংশ নেওয়ার পর সহজেই কাজ পেয়ে যান। বিশেষ পাঁচটি দপ্তরের কাজ নিয়মিত পায় জামালের প্রতিষ্ঠান আক্তার ট্রেডার্স। এগুলো হচ্ছে গণপূর্ত বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। তবে এসব ঠিকাদার স্বনামে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে জামাল আহমদের সাতটি মুঠোফোন নম্বরে ফোন দিলে সবগুলোই বন্ধ পাওয়া যায়। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে আক্তার ট্রেডার্সের কার্যালয়ে যান এই প্রতিবেদক। সেটিও বন্ধ ছিল। আম্বরখানা এলাকার যে ভবনে কার্যালয়, তার চতুর্থ তলায় জামালের বাসা। সেখানেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। বাসায় থাকা একজন গৃহকর্মী বলেন, জামাল ঢাকায় আছেন। কবে ফিরবেন, জানেন না। বাসায় আর কেউ নেই।
প্রথম আলোর অনুসন্ধান ও আক্তার ট্রেডার্সের কাছ থেকে প্রকল্প কেনা ঠিকাদারদের দেওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, জামাল আহমদ চৌধুরী ২০১৪-১৫,২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সিলেট বিভাগের চার জেলায় মোট ৬২টি প্রকল্পের কার্যাদেশ পেয়েছেন। প্রকল্পগুলোর চুক্তিমূল্য প্রায় ১২০ কোটি টাকা। আক্তার ট্রেডার্সের নামে কার্যাদেশ পাওয়ার পর ২৩টি প্রকল্প বিক্রি করে দিয়েছেন জামাল আহমদ। সবগুলোই তিনি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিক্রি করেছেন। বাকি ৩৯টি প্রকল্পের কাজও আক্তার ট্রেডার্স নিজে করেনি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সিলেট গণপূর্ত বিভাগের অধীনে আটটি কাজ পায় আক্তার ট্রেডার্স। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মৌলভীবাজার এলজিইডির অধীনে দুটি ও গণপূর্ত বিভাগের অধীনে তিনটি প্রকল্পের কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের অধীনে নয়টি ও এলজিইডির অধীনে একটি প্রকল্পের কাজ পায় তারা। এই ২৩টি প্রকল্পই বিক্রি করে দিয়েছেন জামাল আহমদ। এর মধ্যে পাঁচটির চুক্তিনামা হাতে পেয়েছে প্রথম আলো।
সিলেট গণপূর্ত বিভাগের অধীনে আটটি প্রকল্পের মধ্যে চারটির চুক্তিমূল্য ১৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। কার্যাদেশ পাওয়া আক্তার ট্রেডার্সের কাছ থেকে দুই দফা হাতবদল হয়ে এখন প্রকল্পগুলোর কাজ করেছে ঢালী কনস্ট্রাকশন। চারটি প্রকল্পের কাজই একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তিনামার মাধ্যমে বিক্রি করেছেন জামাল আহমদ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢালী কনস্ট্রাকশনের প্রকৌশলী জিসান আহমেদ।
মৌলভীবাজার এলজিইডির অধীনে একটি ও সুনামগঞ্জ গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে দুটি প্রকল্পের মোট চুক্তিমূল্য ১২ কোটি টাকা। এই তিনটি প্রকল্পের কাজ কিনেছেন ফরিদ আহমদ নামের এক ঠিকাদার। তিনি এ জন্য কার্যাদেশ পাওয়া আক্তার ট্রেডার্সকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দিয়েছেন বলে জানান।
আক্তার ট্রেডার্সের কার্যাদেশ পাওয়া সুনামগঞ্জ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১১ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প কিনেছেন ঠিকাদার দিব্যজ্যোতি দাশ। প্রকল্পগুলো পেতে তিনি আক্তার ট্রেডার্সকে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা দিয়েছেন বলে জানান। মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ এলজিইডির অধীনে দুটি এবং সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে পাঁচটি প্রকল্প আক্তার ট্রেডার্সের কাছ থেকে কিনেছেন ঠিকাদার সিদ্দিক হোসেন। এই সাতটি প্রকল্পের জন্য তিনি আক্তার ট্রেডার্সকে ৭৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে জানান।
সুনামগঞ্জ গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে দোয়ারাবাজার মডেল থানা ভবন নির্মাণের প্রকল্পটি ৭ কোটি টাকার। এই প্রকল্প কিনেছেন ঠিকাদার দারুল ইসলাম ও তেরাব আলী। তাঁরা আক্তার ট্রেডার্সকে ৭০ লাখ টাকা দিয়েছেন। মৌলভীবাজার গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে মুন্সিবাজার ভূমি কার্যালয় নির্মাণ প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ৫৭ লাখ ২৫ হাজার ৫১৩ টাকা। আর বিশ্বনাথ উপজেলা পরিষদ ভবন নির্মাণের কাজটি ৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকার। দুটি কাজই কিনেছেন ঠিকাদার মো. বাবুল মিয়া। এ জন্য তিনি ৩৯ লাখ টাকা আক্তার ট্রেডার্সকে দিয়েছেন।
আর সিলেট গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে আরও তিনটি প্রকল্পের কার্যাদেশ পায় আক্তার ট্রেডার্স। তবে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর তারা প্রকল্পগুলো আবুল কালাম আজাদ নামের এক ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে দেন। এর বিনিময়ে জামাল আহমদ পেয়েছেন ১ কোটি ১১ লাখ টাকা।
সিলেট গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কুতুব আল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিলেট গণপূর্ত কার্যালয়ে আমি যোগ দিয়েছি ২০১৮ সালে। আমার যোগদানের পরে আক্তার ট্রেডার্স কোনো প্রকল্পের কার্যাদেশ পায়নি। যেসব কাজ পেয়েছে সেগুলো অনেক আগের। প্রকল্পগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটির কাজ শেষ হয়ে গেছে। কিছু রয়েছে, যেগুলো হস্তান্তরের প্রক্রিয়াধীন।’ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে আক্তার ট্রেডার্স কোনো কাজ পেয়েছে, এমনটি বিশ্বাস করেন না তিনি। প্রকল্পের কাজ নিজে না করে অন্যের কাছে বিক্রির বৈধতা আছে কি না, জানতে চাইলে কুতুব আল হোসাইন বলেন, দরপত্রের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এরপর আর ঠিকাদার পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিচালকের অনুপস্থিতিতে প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারে।