রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকায় পুলিশ হাউজিং-১ আবাসিকের ওই বাড়িতে গভীর রাতে অভিযান চালায় ডিবি
রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকায় পুলিশ হাউজিং-১ আবাসিকের ওই বাড়িতে  গভীর রাতে অভিযান চালায় ডিবি

ডিআইজির বাড়িতে অভিযান

মাদক পরীক্ষা না করেই ৮৫ জনকে সাজা, উঠছে নানা প্রশ্ন

পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজির ভাড়া দেওয়া বাসায় অভিযানে কারাদণ্ড হওয়া ৮৫ জনের একজন বাদ্যযন্ত্রশিল্পী। তাঁর বাবা একটি সুপরিচিত ব্যান্ডের একজন স্বনামধন্য সদস্য।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি (বাবা) প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তাঁর ছেলে অতিরিক্ত ডিআইজির ভাড়া দেওয়া বাসায় গিয়েছিলেন অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কাজ পেয়ে। তাঁকে ভ্রাম্যমাণ আদালত মাদক গ্রহণের অভিযোগে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। অথচ তাঁর ছেলে মাদক গ্রহণ করেছিলেন কি না, সেই পরীক্ষা করা হয়নি।

১৯ অক্টোবর দিবাগত রাতে ভাটারার পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১ আবাসিক এলাকার ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ নামের তিনতলা বাড়িটিতে এই অভিযান চালানো হয়।

সোমবার দুপুরে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। ফটকের সামনে থাকা দুটি গাড়ির ওপর ধুলাবালি জমে আছে। সূত্রের দাবি, গাড়ি দুটি অভিযানে আটক হওয়া দুজন ব্যক্তির। তাঁদের কারাগারে পাঠানোর পর গাড়ি নিতে কেউ আসেননি।

অভিযানে আটক ৮৫ জনের মধ্যে ২৬ জন নারী। নারীদের ১৫ দিন করে কারাদণ্ড এবং ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। পুরুষদের এক মাস করে কারাদণ্ড এবং ১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এ অভিযান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। প্রথম প্রশ্ন, কেন মাদক পরীক্ষা ছাড়া সাজা দেওয়া হলো?

দ্বিতীয় প্রশ্ন, সবাইকে দুটি কক্ষে ঢুকিয়ে পুলিশের করা ভিডিও কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল?

তৃতীয় প্রশ্ন, অতিরিক্ত ডিআইজির বাসার আশপাশের প্লটগুলো ফাঁকা। তাহলে জনশান্তি কীভাবে বিঘ্নিত হলো?

চতুর্থ প্রশ্ন, ডিবি কেন অভিযানের আগে ভবনের সিসি ক্যামেরা খুলে ফেলল, সিসি ক্যামেরার ফুটেজের মেমরি কার্ড এখন কোথায় এবং তা কেন জব্দ তালিকায় নেই?

পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতে তিন ঘণ্টা মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে মদের এই চারটি বোতল উদ্ধার করেছে ডিবি

পঞ্চম প্রশ্ন, পুলিশ অভিযোগ করেছে, বাড়িটিতে ডিজে পার্টি হতো। তাহলে জব্দ তালিকায় ডিজে পার্টির সরঞ্জাম নেই কেন?

বাড়িটির মালিক পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আব্দুল্লাহ আল জহির। তিনি সেটি ভাড়া দিয়েছিলেন। অভিযানের ঘটনা এবং তা সংবাদমাধ্যমে আসার পর আব্দুল্লাহ আল জহিরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।

ঘটনাটি নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। এ নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবিও উঠেছে।

পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির

সেই বাড়িতে গিয়ে কী দেখা গেল

পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য সরকারি আবাসন প্রকল্প। ঢাকার কুড়িল থেকে জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে (৩০০ ফুট সড়ক নামে পরিচিত) ধরে সাড়ে চার কিলোমিটার গেলে হাতের বাঁ দিকে পড়ে পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি।

১৪৩ একরের এই প্রকল্পে ১ হাজার ১০০ জনের মতো পুলিশ কর্মকর্তার প্লট রয়েছে। তবে বেশির ভাগই খালি, অল্প কিছু ভবন গড়ে উঠেছে।

ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের সাড়ে তিন কাঠার প্লটে ভবনটি তিনতলা। গাছগাছালিতে ভরা প্লটটির সামনে দুই কাঠার মতো ফাঁকা জায়গা রয়েছে। অনুষ্ঠান হয় মূলত এই ফাঁকা জায়গায়।

ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বাসাটি অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হতো। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাসাভাড়া দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবিতে তাঁর বাসাটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই রকমের বাংলাদেশি প্ল্যাটফর্ম ট্রাভেলাতেও তাঁর বাসা নিবন্ধিত। ফেসবুকের একটি গ্রুপের মাধ্যমেও বাসাটি অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়।

সোমবার দুপুরে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। ফটকের সামনে থাকা দুটি গাড়ির ওপর ধুলাবালি জমে আছে। সূত্রের দাবি, গাড়ি দুটি অভিযানে আটক হওয়া দুজন ব্যক্তির। তাঁদের কারাগারে পাঠানোর পর গাড়ি নিতে কেউ আসেননি।

অভিযানের দিন কী হয়েছিল

ডিআইজির ভাড়া দেওয়া বাড়িতে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) উত্তরা ডিভিশনের একটি দল।

ডিএমপি ও ডিবি সূত্র, সাজাপ্রাপ্তদের স্বজন এবং অভিযানের সময় উপস্থিত সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাত আটটা থেকে ওই বাড়িতে অতিথিরা যেতে শুরু করেন। রাত ১২টা পর্যন্ত ধাপে ধাপে ৮৫ জন সেখানে উপস্থিত হন।

রাত সাড়ে ১২টার দিকে ডিবির ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল বাড়িটিতে প্রবেশ করে। তখন প্রধান ফটক খোলা ছিল। পুলিশ সদস্যরা ভেতরে ঢুকেই ভবনের বাইরে আড্ডা দেওয়া অতিথিদের কক্ষে যেতে বলেন। পরে সবাইকে জোর করে দুটি কক্ষে ঢোকানো হয়। এতে প্রায় আধা ঘণ্টা সময় লাগে।

সূত্র বলছে, এরপর পুলিশ সদস্যরা বাড়িতে কোথায় কোথায় সিসি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরা রয়েছে, তা খুঁজতে থাকেন। ছয়টি ক্যামেরার মধ্যে চারটি খুলে নেওয়া হয়। বাকি দুটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মেমোরি কার্ড খুলে নেওয়া হয়।

সিসি ক্যামেরা খোলার পর বাড়িটিতে তল্লাশি চালানো হয়। সূত্র বলছে, প্রথম দফায় কোনো মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়নি। এ সময় পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে মাদকদ্রব্য থাকলে তা জমা দিতে বলেন। কিন্তু কেউ কিছু জমা দেননি। দ্বিতীয় দফায় তল্লাশিতে দুটি খালি মদের বোতল পাওয়া যায়।

সারা রাত দুটি কক্ষে আটকে রাখার পরে ভোরের দিকে ৮৫ জনকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাঁদের সাজা দেওয়া হয়।

এর আগে কক্ষের ভেতরে এবং সেখান থেকে আটক ব্যক্তিদের বের করার সময় পুলিশ সদস্যরা ভিডিও করেন।

ওই বাড়িতে পার্টি আয়োজনের বিষয়ে আগে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য ছিল না। পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর তাঁরা অভিযান পরিচালনা করেন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে মাদক সেবন ও ডিজে পার্টি করা হতো।
ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবীর

যেকোনো অভিযানের পর পুলিশকে জব্দতালিকা তৈরি করতে হয়। ডিবির তৈরি তালিকায় দেখা যায়, অভিযানে ওই বাড়ি থেকে চারটি মদের বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। একটি দেশীয় কেরু অ্যান্ড কোম্পানির তৈরি মদের ৭৫০ মিলিলিটারের বোতল। সেটি খালি ছিল। বিদেশি একটি ব্র্যান্ডের এক লিটার মদের একটি বোতল, যাতে আনুমানিক ৫০০ মিলিলিটার মদ ছিল। বিদেশি মদের আরেকটি বোতলে ২০০ মিলিলিটারের মতো মদ ছিল। এক লিটারের একটি বোতল ভরা পাওয়া যায়।

বাড়িটি থেকে একটি ইয়াবা বড়ি ও ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম এবং একচিলতে পরিমাণ কুশ উদ্ধারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে ডিবির জব্দতালিকায়।

অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবীর। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ওই বাড়িতে পার্টি আয়োজনের বিষয়ে আগে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য ছিল না। পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর তাঁরা অভিযান পরিচালনা করেন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে মাদক সেবন ও ডিজে পার্টি করা হতো।

ইলিয়াস কবীর গত ১২ আগস্টের রাজধানীর আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে অভিযানের সময় একজন নারীকে মুখ ঢাকতে বাধা দিচ্ছেন, এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওর সময় কাঁদতে থাকা এক নারীর উদ্দেশে তিনি বলছিলেন, ‘মুখ ঢাকবি না, মাইর হবে।’

বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তখন মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, কোনো নারী কোনো অপরাধ করলে তাঁর বিচার হবে এবং আদালত তথ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে শাস্তি দেবেন; কিন্তু পুলিশ বিচারের আগেই একধরনের শাস্তির আয়োজন করছে, যা বেআইনি।

মাদক সেবনের পরীক্ষা ছাড়াই সাজা

ডিএমপির উত্তরা বিভাগের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান ডিআইজির ভাড়া বাসা থেকে আটক ব্যক্তিদের সাজা দেন। ৪০ জনের কাছ থেকে জরিমানা আদায়ের একটি নথিতে অপরাধের জায়গায় মাদক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬ (৫) ধারার কথা বলা আছে।

ধারাটিতে বলা হয়েছে, মাদক গ্রহণ করে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জনসাধারণের শান্তি বিনষ্ট করলে, বিরক্তিকর কোনো আচরণ করলে এবং গাড়ি চালালে অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

ডিবির দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অপরাধ কতটা প্রমাণিত হয়েছে, কিসের ভিত্তিতে সাজা দেওয়া হয়েছে, এটা সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট ভালো বলতে পারবেন। বিচারের দায়িত্ব তো আমাদের না।’

স্বজনেরা আরও বলছেন, মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে একটি কাগজে সই নেওয়া হয়েছিল। অথচ পরে তাঁকে মাদক গ্রহণের দায়ে সাজা দেওয়া হয়।

সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে কেউ নেশাগ্রস্ত ছিলেন কি না, সেটা পরীক্ষা করা হয়নি। ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামানও বিষয়টি প্রথম আলোর কাছে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আসামিরা দোষ স্বীকার করায় তাঁদের সাজা দেওয়া হয়েছে।

সাজা পাওয়া ব্যক্তিদের কয়েকজনের স্বজন প্রথম আলোকে বলেছেন, দোষ স্বীকার করার কথাটি ঠিক নয়। তাঁরা কারাগারে সাজাপ্রাপ্তদের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি জানতে চেয়েছিলেন। কারণ, তাঁরা আপিলের চেষ্টা করছেন।

স্বজনেরা আরও বলছেন, মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে একটি কাগজে সই নেওয়া হয়েছিল। অথচ পরে তাঁকে মাদক গ্রহণের দায়ে সাজা দেওয়া হয়।

আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, দোষ স্বীকার করলেই মাদক মামলায় সাজা দিয়ে দেওয়া যায় না। ডিবি ভয় দেখিয়ে আসামিদের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে নিতে পারে। ম্যাজিস্ট্রেটের উচিত ছিল ডিবির অভিযোগকে অবিশ্বাস করা। মাদক পরীক্ষা করে প্রমাণ পেলে সাজা দিতে অসুবিধা কোথায়। এখন তো পরীক্ষার সহজ উপায় আছে।

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরও বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতে জাজ, জুরি, এক্সিকিউশনার একই পক্ষ হয়ে যান। ম্যাক্সিমাম ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার হয় না।’

পুরো অভিযান নিয়েই জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার ‘খটকা’ লেগেছে। তিনি বলেন, পুলিশ কর্মকর্তার ভাড়া দেওয়া বাসায় কোনো অপরাধ হলে তা তো পুলিশের চেপে যাওয়ার কথা। তার বদলে সেখানে অভিযান এবং তা প্রচার করা সন্দেহজনক।

অভিযানে যাঁদের সাজা দেওয়া হয়েছে, তাঁরা মূলত বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি ও দেশীয় করপোরেটে চাকরিজীবী, উদ্যোক্তা এবং সুপরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

একজনের স্বজন বলেন, ডিবি চারটি মদের বোতল উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে একটি পুরো ভরা, দুটি আংশিক ভরা, একটি খালি। ৮৫ জন মানুষ মিলে কি এই সামান্য মদপান করে নেশাগ্রস্ত হয়েছেন? তিনি আরও বলেন, আসলে মানুষকে অন্যায়ভাবে সাজা দেওয়া হয়েছে।

ভিডিও বাইরে গেল কীভাবে

সংবিধানের ৩৫ (বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে রক্ষণ)-এর ৫ ধারায় বলা হয়েছে, কাউকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না বা কারও সঙ্গে এ ধরনের ব্যবহারও করা যাবে না।

জাতিসংঘ সনদের ২(১) ও ৪ অনুচ্ছেদে সদস্যদেশগুলোকে নির্যাতন, নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর ব্যবহার এবং দণ্ডকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আইন প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে।

গ্রেপ্তার বা সন্দেহভাজন হিসেবে আটক হওয়া কোনো ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা থেকে বিরত থাকতে ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করেন হাইকোর্ট। স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‍্যাবের মহাপরিচালক ও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারসহ বিবাদীদের দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল।

আসামিদের ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে যদি এসব ছবি বা ভিডিও ছড়ানো হয়ে থাকে, তাহলে তারা তা করতে পারে কি না, সে প্রশ্ন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাগুলো কতটা লঙ্ঘিত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকে পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনী সংবাদমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে আটক অথবা গ্রেপ্তার ব্যক্তির মুখমণ্ডল অস্পষ্ট (ব্লার) করে দেওয়া শুরু করে। কিন্তু এবার ডিবির অভিযানের ঘটনায় করা ভিডিও পুলিশের মাধ্যমেই বাইরে এসেছে এবং তা ছড়িয়ে পড়েছে। যেসব সংবাদমাধ্যম মুখ অস্পষ্ট না করে প্রতিবেদন করেছে, তারাও সমালোচনার মুখে পড়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী প্রথম আলোকে বলেন, আসামিদের ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে যদি এসব ছবি বা ভিডিও ছড়ানো হয়ে থাকে, তাহলে তারা তা করতে পারে কি না, সে প্রশ্ন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাগুলো কতটা লঙ্ঘিত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিরোধ থেকেই কি অভিযান

আব্দুল্লাহ আল জহির অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশ সদর দপ্তরের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-২ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। এ বিভাগ থেকে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), পরিদর্শক, সহকারী উপপরিদর্শক (সশস্ত্র), সহকারী টাউন সাব-ইন্সপেক্টর (এটিএসআই) ও নায়েক পদমর্যাদার সদস্যদের বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির কাজ করা হয়।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওসি বদলিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পুলিশের প্রভাবশালী একটি পক্ষের সঙ্গে আব্দুল্লাহ আল জহিরের বিরোধ ছিল। এর জেরেই ১ অক্টোবর তাঁকে ওই বিভাগ থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত শাখায় পদায়ন করা হয়। পরে বাড়িটিতে অভিযান চালানো হয়।

বিষয়টি নিয়ে ডিবির দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলামের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তবে এ প্রশ্ন করার আগেই তিনি ফোন কেটে দেন।

অন্যদিকে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ২২ বছর ধরে পুলিশে চাকরি করি। আমার সম্পর্কে কোনো অভিযোগ এলে ন্যূনতম খোঁজ নেওয়া যেত, যাচাই করা যেত।’

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

এদিকে নারীসহ ৮৫ জনকে গ্রেপ্তার ও সংক্ষিপ্ত বিচারে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়ে রোববার বিবৃতি দিয়েছেন ১০১ জন নাগরিক। তাঁরা আটক ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তি, ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবন, গোপনীয়তা ও মর্যাদায় হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

রোববার আরেকটি বিবৃতিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে গণহারে সাজা দেওয়া বন্ধের আহ্বান জানায় ব্লাস্ট, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস), নারীপক্ষ ও সপ্রাণ।

বিবৃতিতে তারা বলেছে, আটক ও দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার বা অধিকার লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের ছবি, ভিডিও ও পরিচয়সহ ব্যক্তিগত উপাত্ত বেআইনিভাবে সংগ্রহ, প্রচার ও প্রকাশের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায় তারা।

সাজাপ্রাপ্ত একজনের স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঘটনাটির একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। সরকারের কাছে তাঁদের এটাই প্রত্যাশা।