ছিলেন রসায়নের শিক্ষক, জাপানে পাঠানোর কথা বলে হাতিয়ে নিলেন ৭৫ লাখ টাকা

জাপানে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ৭৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে সাইদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ
ছবি: সংগৃহীত

জাপানি ভাষা শিক্ষা দেওয়ার অনুমোদন নিয়ে রাজধানীর মিরপুরে ওয়েসিস নেট লিংক লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান খুলেছিলেন সাইদুল ইসলাম। কিন্তু তিনি কখনো জাপানি ভাষা শেখাননি। বরং ওয়ার্কিং ভিসায় (কাজের ভিসা) তিন মাসের মধ্যে জাপানে পাঠানো হয়— ফেসবুকে এমন বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করেন। এমন বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে একে একে ৫০ জন জাপানে যাওয়ার জন্য দেড় লাখ করে সাইদুলের হাতে মোট ৭৫ লাখ টাকা তুলে দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাউকে জাপানে পাঠাতে না পারায় ভুক্তভোগীরা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁদের টাকা ফেরত চান।

কিন্তু সাইদুল টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে টালবাহানা করতে থাকেন। অবশেষে ভুক্তভোগীরা টাকা উদ্ধারে পুলিশের দ্বারস্থ হন। তদন্ত করে পুলিশ জানতে পারে, সাইদুল একজন প্রতারক। ভুক্তভোগীদের পক্ষে জাহিদ হাসান নামের এক যুবক তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকা থেকে সাইদুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

জানতে চাইলে মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসিন প্রথম আলোকে বলেন, সাইদুল প্রতারণায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

জিজ্ঞাসাবাদে সাইদুল পুলিশকে জানিয়েছেন, তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতকোত্তর করেছেন। এরপর ২০০৫ সালে রাজধানীর একটি কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। এরপর যোগ দেন আরেকটি কলেজে। সেখানে সহযোগী অধ্যাপক ও রসায়ন বিভাগের প্রধান হন।

পরে বন্ধুদের সঙ্গে ব্যবসায় নামেন সাইদুল। কয়েকটি ব্যবসায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বন্ধুরা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন। এরপর ২০১৯ সালে তিনি প্রতারণায় নামেন। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে মিরপুর থানায় তিনটি মামলা রয়েছে।  

ভুক্তভোগী ও মামলার বাদী জাহিদ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি জাপানে যাওয়ার জন্য ২০১৬ সালে জাপানি ভাষা শেখেন। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ফেসবুকে একটি বিজ্ঞাপন চোখ পড়ে তাঁর। সেখানে বলা হয়, যাঁরা জাপানি ভাষা জানেন, তাঁদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেখানে নেওয়া হবে। পরে ওই বিজ্ঞাপনের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতায় সাইদুলের অফিসে যান জাহিদ। ফেসবুকের বিজ্ঞাপন দেখে তাঁর মতো আরও অন্তত ৫০ জন ওই অফিসে যান।

এ সময় সাইদুল সবাইকে বলেন, জাপান থেকে স্কাইপের মাধ্যমে সবার পরীক্ষা নেওয়া হবে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তাঁদের জাপানে পাঠানো হবে। এমন আশ্বাসে  প্রার্থীরা সবাই পরীক্ষায় অংশ নেন। পরে সাইদুল তাঁদের জানান, ৫০ জনই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।

জাহিদ জানান, এরপর সাইদুল সবার হাতে একটি কাগজ তুলে দিয়ে বলেন, সবার ‘ডিমান্ড লেটার’ হয়ে গেছে। তাঁর কথামতো সবাই পাসপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স (ছাড়পত্র) সনদ ও মেডিকেল ফি তাঁর হাতে তুলে দেন। এরপর কয়েক দফায় ৫০ জনের প্রত্যেকের কাছ থেকে দেড় লাখ করে মোট ৭৫ লাখ টাকা নেন সাইদুল।

ভুক্তভোগী জাহিদ হাসান আরও বলেন, সাইদুল তিন মাসের মধ্যে জাপানে পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু পাঁচ মাস পরেও তাঁদের জাপানে পাঠানোর কোনো অগ্রগতি দেখতে না পেয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন। তখন সাইদুল তাঁদের পাঠাবেন, পাঠাচ্ছেন বলে আশ্বাস দিতে থাকেন। একপর্যায়ে বলেন, জাপানের কোম্পানিটি তাঁর কাছ থেকে ৭০ লাখ টাকা নিয়ে গেছে। তাই সবাইকে অন্যত্র চাকরি খুঁজতে পরামর্শ দেন তিনি। পরে ভুক্তভোগীরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন তাঁরা প্রতারিত হয়েছেন।

এরপর মিরপুর থানায় গিয়ে তাঁরা পুলিশের সহযোগিতা চান। পরে পুলিশ ঘটনার সত্যতা পায়। পুলিশের পরামর্শে বুধবার প্রতারণার অভিযোগে সাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করেন জাহিদ। এরপর পুলিশ সাইদুলকে গ্রেপ্তার করে।