নাজমা বেগম ও আলমগীর কবির
নাজমা বেগম ও আলমগীর কবির

স্ত্রী হত্যা দিয়ে শুরু, এরপর ১২ বছর ধর্ষণ-খুনের মতো অপরাধে জড়িয়েছেন তিনি

স্ত্রীকে হত্যা করে পালিয়ে গিয়েছিলেন মনিরুজ্জামান মাতুব্বর ওরফে হৃদয়। ঘটনাটি ১২ বছর আগের। স্ত্রী হত্যা মামলায় চার বছর কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে আবার গা ঢাকা দেন তিনি। এরপর একের পর এক অপরাধে জড়ান। এক নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায়ও তাঁর নাম আসে। সর্বশেষ ঢাকার আশুলিয়ায় অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তাঁর স্বামীকে হত্যার ঘটনায় তদন্তে বেরিয়ে আসে মনিরুজ্জামানের নাম। গ্রেপ্তারের পর ওই হত্যার দায় তিনি আদালতে স্বীকার করেছেন।

পুলিশ বলেছে, একের পর এক গুরুতর অপরাধে জড়িয়েছেন মনিরুজ্জামান। বর্তমানে তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।

স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগ

পারিবারিক সূত্র জানায়, মনিরুজ্জামান ওরফে মনির হোসেন ওরফে হৃদয় মাতুব্বরের (৪৪) বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার দামদরদি গ্রামে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি উগ্র ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির ছিলেন। বিয়ে করার পরও তাঁর আচরণে পরিবর্তন আসেনি। এ কারণে পরিবারের সদস্যরা তাঁর ওপর নাখোশ ছিলেন।

পুলিশ জানায়, ২০১৪ সালে নগরকান্দায় নিজের স্ত্রী রাহেলা বেগমকে হত্যার অভিযোগ ওঠে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। তিনি পালিয়ে যান। ওই ঘটনায় ফরিদপুরের নগরকান্দা থানায় তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগরকান্দা থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল কুদ্দুস প্রথম আলোকে বলেন, মনির বখাটে প্রকৃতির ছিলেন। কারণে-অকারণে প্রতিবেশী ও গ্রামের মানুষের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতেন। পরিবার তাঁকে বিয়ে করিয়েছিল, যাতে ঘর-সংসারে মন দিয়ে স্বাভাবিক জীবন শুরু করেন। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই মনির তাঁর ঘুমন্ত স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে গা ঢাকা দেন। একপর্যায়ে পুলিশ ঢাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

এসআই আবদুল কুদ্দুস বলেন, স্ত্রী হত্যা মামলায় মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। চার বছর কারাভোগের পর ২০১৮ সালে জামিনে মুক্তি পান তিনি। এরপর কিছুদিন বাড়িতে থাকার পর আবার পালিয়ে যান। স্ত্রী হত্যা মামলায় পলাতক থাকায় আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

আশুলিয়ায় গা ঢাকা

স্ত্রী হত্যা মামলায় জামিনে মুক্ত হওয়ার পর মনিরুজ্জামান ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়ায় গা ঢাকা দেন। সেখানেই তাঁর বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। পিবিআইয়ের তদন্তে সম্প্রতি আশুলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় তাঁর নাম বেরিয়ে আসে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে মধ্য আশুলিয়ার জামগড়ার আবাসিক ভবনের একটি ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় অন্তঃসত্ত্বা নাজমা বেগম (৩৯) ও তাঁর স্বামী আলমগীর কবিরের (৪৫) মরদেহ। খাটের ওপর পড়ে ছিল নাজমা বেগমের মরদেহ। আঘাতের ফলে ভূমিষ্ঠ নবজাতকের মরদেহও সেখানে পড়ে ছিল। আর আলমগীর কবিরের মরদেহ ছিল একই কক্ষের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় দড়ি প্যাঁচানো অবস্থায়। নাজমা তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। ঘটনার সময় আলমগীর বেকার ছিলেন, আগে তিনি ফেরি করে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতেন। তাঁদের দুজনের বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায়।

ওই ঘটনায় নাজমার বড় বোন শাপলা বেগম বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা জেলা মামলাটির তদন্তভার নেয়।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামসুল আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের কোনো সূত্র ছিল না। পিবিআই গুপ্তচর নিয়োগ করে মনিরুজ্জামানকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করে। এরপর ৮ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে আলমগীর ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেন মনিরুজ্জামান এবং ঘটনার বিস্তারিত জানান। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহত নাজমার পার্স, সিমসহ মুঠোফোন ও পরিচয়পত্র উদ্ধার করে পিবিআই।

দাওয়াত দিয়ে ডেকে নেওয়া হয়েছিল

পিবিআই কর্মকর্তা শামসুল আরেফিন বলেন, তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, স্ত্রী হত্যা মামলায় জামিনে মুক্ত হওয়ার পর মনিরুজ্জামান আশুলিয়ায় এলাকায় গা ঢাকা দেন। সেখানে আলমগীরের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। খুন হওয়ার আগে আলমগীর বেকার ছিলেন। আর মনিরুজ্জামান সবজির ব্যবসা করতেন। তাঁদের উভয়ের বাসা ছিল কাছাকাছি। নাজমাকে বিয়ে করার প্রলোভন দেখিয়ে অনেক আগে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন মনিরুজ্জামান। বিষয়টি জানতে পেরে আলমগীরের সঙ্গে মনিরুজ্জামানের বিরোধ দেখা দেয়।

গত ২ সেপ্টেম্বর মনিরুজ্জামানকে দাওয়াত দিয়ে আলমগীর ও তাঁর স্ত্রী নিজেদের বাসায় ডেকে নেন। মনিরুজ্জামান আলমগীরের বাসায় পৌঁছানোর পর আলমগীর তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে মনিরুজ্জামানের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি ও ঝগড়াঝাঁটিতে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাঁদের তাঁদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এ সময় নাজমা ঝাঁটা দিয়ে মনিরুজ্জামানকে আঘাত করেন। মনিরুজ্জামানও তাঁর পেটে লাথি মারেন। এতে নাজমা খাটের ওপর পড়ে যান। আঘাতের ফলে তাঁর পেটের বাচ্চা বেরিয়ে যায়। নাজমা ও তাঁর গর্ভের সন্তান মারা যায়। এ সময় আলমগীর খুন্তি ও পাইপ দিয়ে মনিরুজ্জামানকে আঘাত করেন। আলমগীরের গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন মনিরুজ্জামান।

পরে মরদেহটি সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখেন এবং নাজমার ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েড মুঠোফোন, সিমকার্ড, পরিচয়পত্র এবং তাঁর ব্যবহৃত পার্স নিজের বাসায় নিয়ে যান। ওই ঘটনায় মনিরুজ্জামান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

মনিরুজ্জামান

আরও একটি ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ

পিবিআই কর্মকর্তা শামসুল আরেফিন বলেন, পিবিআইয়ের তদন্তে আরও বেরিয়ে এসেছে, ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর মনিরুজ্জামান ও তাঁর দুই সহযোগী এক নারীকে ধরে আশুলিয়ার নয়ানগরের একটি জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করেন। পরে ওই নারীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে মনিরুজ্জামান এ কথা স্বীকার করেছেন। ওই ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার আট মাসের মাথায় জামিনে মুক্ত হন মনিরুজ্জামান। দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি চলার মধ্যেই পরে আশুলিয়ার জামগড়ার ওই বাসায় ঢুকে আলমগীর, তাঁর স্ত্রী নাজমা এবং নাজমার গর্ভের সন্তানকে হত্যা করেন মনিরুজ্জামান।

পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক নেই

মনিরুজ্জামানের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জড়িয়ে পড়ায় তাঁর পরিবারের সদস্যরাও তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। মনিরুজ্জামানের বড় বোন তাসলিমা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ভাই উগ্র ও অবাধ্য স্বভাবের। এ নিয়ে মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যরা সব সময় চরম নাখোশ ও অসন্তুষ্ট ছিলেন। সন্তানের আচরণে মনের কষ্ট নিয়ে প্রায় ৪০ দিন আগে তাঁদের বাবা জব্বার মাতুব্বর মারা গেছেন। মা এখন অসুস্থ।

তাসলিমা বেগম বলেন, পরিবারের সদস্যরা মনিরের অপরাধমূলক আচরণের কারণে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। তিনি যে অপরাধ ও পাপ করেছেন, প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তি হলেও পরিবারের কোনো আপত্তি বা আক্ষেপ নেই। তাসলিমা বেগম জানান, স্ত্রী হত্যা মামলায় কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর মনিরুজ্জামান ঠিকমতো আদালতে হাজিরা দিতেন না। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। এরপর তিনি ফরিদপুরের নগরকান্দা ছেড়ে চলে যান। পরিবারের সদস্যরাও মনিরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। মনিরুজ্জামানের প্রথম স্ত্রীর সংসারে একটি মেয়ে রয়েছে। সেই মেয়েকে এখন তাঁর মা পড়াশোনা করাচ্ছেন।

পিবিআই কর্মকর্তারা জানান, স্ত্রী হত্যার অভিযোগ দিয়ে যে অপরাধজীবনের শুরু, পরবর্তী সময়ে একের পর এক গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ আশুলিয়ায় আলমগীর এবং গর্ভের সন্তানসহ নাজমাকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।