মো. জোবায়েদ হোসেন
মো. জোবায়েদ হোসেন

অন্তরঙ্গ ভিডিও ফাঁসের আশঙ্কায় জোবায়েদকে হত্যা, তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

হত্যার আগের রাত পর্যন্ত কথা হয়েছিল দুজনের। ঘটনার দিনও গৃহশিক্ষক হিসেবে ছাত্রীকে পড়াতে গিয়েছিলেন ছাত্রদলের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. জোবায়েদ হোসাইন। কিন্তু ওই বাসা থেকে তিনি আর জীবিত বের হতে পারেননি। প্রায় ৯ মাসের তদন্ত শেষে পুলিশের অভিযোগপত্র বলছে, এক মাস ধরে পরিকল্পনা করেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।

নজরদারি, ঘটনাস্থল রেকি, অস্ত্র কেনা, গতিবিধি অনুসরণ—সব প্রস্তুতি শেষে গত বছরের ১৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় জোবায়েদকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। তদন্তে উঠে এসেছে, প্রেমের সম্পর্কের জটিলতা এবং অন্তরঙ্গ ছবি–ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাই ছিল এই হত্যার মূল কারণ।

প্রায় ৯ মাসের তদন্ত শেষে গত ৩০ জুন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আশরাফ হোসেন। এতে অভিযুক্ত করা হয়েছে ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষা (১৯), তাঁর প্রেমিক মাহির রহমান (১৯) এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লানকে (২১)।

পুলিশের ভাষ্য, মাহির ছিলেন মূল হামলাকারী, বর্ষা হত্যার পরিকল্পনাকারী এবং আয়লান সহযোগী।

মোবাইল ফরেনসিক বিশ্লেষণে জোবায়েদ ও বর্ষার অন্তরঙ্গ সম্পর্কের তথ্যও পাওয়া গেছে। পরে মাহিরের সঙ্গে বর্ষার সম্পর্ক আবার শুরু হলে জোবায়েদের কাছে থাকা ছবি ও ভিডিও ফাঁস হয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই দুজন তাঁকে ‘হুমকি’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে ৫০ জন সাক্ষীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফরেনসিক, ডিএনএ পরীক্ষা ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক আলামতের বিশ্লেষণ যুক্ত করা হয়েছে।

গত বছরের ১৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আরমানিটোলার ১৫ নুরবক্স লেনের রৌশান ভিলা নামের একটি বাসার সিঁড়ি থেকে জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ভবনেই তিনি বর্ষাকে টিউশনি করাতেন। এ ঘটনায় এক দিন পর নিহত জোবায়েদের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বাদী হয়ে বংশাল থানায় হত্যা মামলা করেন।

জোবায়েদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কুমিল্লা জেলা ছাত্রকল্যাণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন। ফরাশগঞ্জে মেসে থাকতেন তিনি।

হত্যার আগের রাত পর্যন্তও বর্ষা ও জোবায়েদের মধ্যে প্রেমিক-প্রেমিকার মতো কথোপকথন হয়েছিল। ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্ষা অত্যন্ত সুকৌশলে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। ফলে জোবায়েদ কোনোভাবেই হত্যার পরিকল্পনার আভাস পাননি।
মো. আশরাফ হোসেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা

প্রেমের টানাপোড়েন থেকে হত্যার নকশা

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বর্ষা ও মাহির ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে চিনতেন এবং তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মাহির বোরহানউদ্দিন কলেজে আর বর্ষা ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়তেন। একপর্যায়ে তাঁদের সম্পর্কে বিচ্ছেদ হলে গৃহশিক্ষক জোবায়েদের সঙ্গে বর্ষার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

মোবাইল ফরেনসিক বিশ্লেষণে জোবায়েদ ও বর্ষার অন্তরঙ্গ সম্পর্কের তথ্যও পাওয়া গেছে। পরে মাহিরের সঙ্গে বর্ষার সম্পর্ক আবার শুরু হলে জোবায়েদের কাছে থাকা ছবি ও ভিডিও ফাঁস হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই দুজন তাঁকে ‘হুমকি’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এ কারণেই গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁরা জোবায়েদকে হত্যার পরিকল্পনা শুরু করেন। প্রায় এক মাস ধরে বিভিন্নভাবে পরিকল্পনা করে শেষ পর্যন্ত হত্যার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্ষা নিয়মিত জোবায়েদের টিউশনে আসা–যাওয়ার তথ্য মাহিরকে জানাতেন। ১৯ অক্টোবর ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে জোবায়েদ নিজের লাইভ লোকেশন বর্ষাকে পাঠান। সেই তথ্য পাওয়ার পরই ওত পেতে থাকা মাহির ও আয়লান হামলা চালান।

রেকি থেকে হামলা: এক মাসের প্রস্তুতি

তদন্তে বলা হয়েছে, হত্যার ৮ থেকে ৯ দিন আগে মাহির ও তাঁর বন্ধু আয়লান ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন। পরে দুটি সুইচ গিয়ার ছুরি কেনেন। কয়েক দিন ধরে জোবায়েদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তাঁরা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্ষা নিয়মিত জোবায়েদের টিউশনে আসা–যাওয়ার তথ্য মাহিরকে জানাতেন। ১৯ অক্টোবর ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে জোবায়েদ নিজের লাইভ লোকেশন বর্ষাকে পাঠান। সেই তথ্য পাওয়ার পরই ওত পেতে থাকা মাহির ও আয়লান হামলা চালান।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, জোবায়েদের ঘাড়ে প্রায় ১০ ইঞ্চি লম্বা সুইচ গিয়ার ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়।

ফরেনসিক প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ছুরির আঘাতে জোবায়েদের গলার ডান পাশের ক্যারোটিড আর্টারি ও ইন্টারনাল জুগুলার ভেইন ছিন্ন হয়ে যায়। উদ্ধার হওয়া ছুরিতে মাহিরের ডিএনএও পাওয়া গেছে।

অভিযোগপত্রে দেওয়া ডিএনএ প্রতিবেদন মাহিরের সঙ্গে মিলে গেছে। এ ছাড়া অভিযোগপত্রে তাঁর ১৬৪ ধারার জবানবন্দিসহ গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। মাহিরের বের হওয়ার সুযোগ নেই। কেউই ছাড় পাবেন না।
ইশতিয়াক হোসেন জিপু, বাদীপক্ষের আইনজীবী

‘বর্ষা আমাকে প্রতিদিন চাপ দিত’

অভিযোগপত্রে মাহিরের দেওয়া জবানবন্দির উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয়েছে।

সেখানে মাহির বলেছেন, বর্ষা তাঁকে নিয়মিত জোবায়েদকে হত্যা করতে চাপ দিতেন। ধরা পড়লে কী হবে—এমন প্রশ্ন করলে বর্ষা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন, তাঁদের পরিবারে অনেক আইনজীবী আছেন।

মাহির তাঁর জবানবন্দিতে দাবি করেছেন, ‘মারার পর ধরা পড়লে সামাল দিব কেমনে—বর্ষাকে এই প্রশ্ন করলে বর্ষা উত্তর দেয়, ওর (বর্ষার) বাসায় অনেক অ্যাডভোকেট আছেন। কোথায় মারা যায়? এই প্রশ্নে বর্ষা জানায়, “বর্ষার বাসার নিচে সুনশান নীরবতা, ওখানে মারলে সুবিধা হইব।” বর্ষা আমাকে ডেইলি চাপ দিত মারার জন্য। ঘটনার দিন ১৯ অক্টোবর বেলা একটার দিকে বর্ষা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “কখন মারবা।”’

জবানবন্দিতে মাহির আরও দাবি করেন, ২টি সুইচ গিয়ার ছুরি কিনতে তাঁর ৬০০ টাকা লেগেছে। এর মধ্যে ৫০০ টাকা বর্ষা তাঁকে বিকাশের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন।

জবানবন্দি অনুযায়ী, জোবায়েদ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর বর্ষার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে কথা–কাটাকাটির একপর্যায়ে মাহির ব্যাগ থেকে ছুরি বের করে আঘাত করেন। তিনি আয়লানকে ছুরি নিয়ে এগিয়ে আসতে বললে আয়লান যাননি।

জবানবন্দিতে মাহির বলেছেন, বর্ষা তাঁকে নিয়মিত জোবায়েদকে হত্যা করতে চাপ দিতেন। ধরা পড়লে কী হবে—এমন প্রশ্ন করলে বর্ষা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন, তাঁদের পরিবারে অনেক আইনজীবী আছেন।

রক্তাক্ত অবস্থায় বাঁচার আকুতি

তদন্তে উঠে এসেছে, হামলার পর রক্তাক্ত অবস্থায় জোবায়েদ কোনোভাবে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে বর্ষার সামনে যান এবং তাঁকে বাঁচানোর আকুতি জানান।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বর্ষা তাঁর জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন, সে সময় তিনি জোবায়েদকে বলেন, ‘তোর মতো পাপিকে উচিত শিক্ষা দেওয়া উচিত।’

পুলিশের দাবি, হত্যার কয়েক দিন আগেই মাহির ও আয়লান জোবায়েদকে সরাসরি হুমকি দিয়েছিলেন এবং বর্ষাকে আর না পড়ানোর জন্য সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু জোবায়েদ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. আশরাফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, হত্যার আগের রাত পর্যন্তও বর্ষা ও জোবায়েদের মধ্যে প্রেমিক-প্রেমিকার মতো কথোপকথন হয়েছিল। ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্ষা অত্যন্ত সুকৌশলে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। ফলে জোবায়েদ কোনোভাবেই হত্যার পরিকল্পনার আভাস পাননি।

আমি আগেও বলেছি, আমার মেয়ে নির্দোষ। এখনো বলছি, আমার মেয়ে নির্দোষ।
আনিকা রহমান, অভিযুক্ত বর্ষার মা

অভিযোগপত্র আদালতে, শুনানি ১২ আগস্ট

আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগপত্রটি ১৩ জুলাই জিআরও শাখায় পৌঁছেছে। ওই দিন যথাসময়ে উপস্থাপন করা সম্ভব না হওয়ায় আগামী ১২ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত।

প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক কামাল হোসেন প্রথম আলোকে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

অভিযোগপত্র পাওয়ার কথা জানিয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশতিয়াক হোসেন জিপু প্রথম আলোকে বলেন, অভিযোগপত্রে দেওয়া ডিএনএ প্রতিবেদন মাহিরের সঙ্গে মিলে গেছে। এ ছাড়া অভিযোগপত্রে তাঁর ১৬৪ ধারার জবানবন্দিসহ গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। মাহিরের বের হওয়ার সুযোগ নেই। কেউই ছাড় পাবেন না।

যেহেতু এটি একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা, বিচারিক প্রক্রিয়া যেন দ্রুত শুরু ও শেষ হয়, এটাই চাওয়া। দ্রুত বিচার হলে মানুষ বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেবেন।
এনায়েত হোসেন, জোবায়েদের বড় ভাই ও মামলার বাদী

‘আমার মেয়ে নির্দোষ’

অভিযুক্ত বর্ষার মা আনিকা রহমান ১৪ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, আমার মেয়ে নির্দোষ। এখনো বলছি, আমার মেয়ে নির্দোষ।’

অন্যদিকে জোবায়েদের বড় ভাই ও মামলার বাদী এনায়েত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, অভিযোগপত্রে তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে তদন্ত কর্মকর্তা তাঁকে জানিয়েছেন।

এনায়েত হোসেন বলেন, ‘যেহেতু এটি একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা, বিচারিক প্রক্রিয়া যেন দ্রুত শুরু ও শেষ হয়, এটাই চাওয়া। দ্রুত বিচার হলে মানুষ বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেবেন।’