চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, দস্যুতা ও অপহরণ—২০২৫ সালে এসব অপরাধের মামলার সংখ্যা বেড়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, মামলা বৃদ্ধি মানে অপরাধও বৃদ্ধি। এ ধরনের অপরাধ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও চলাচলে বেশি প্রভাব ফেলে এবং নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হয়। অবশ্য অন্য অপরাধও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।
অপরাধ একজন মানুষের জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তার একটি উদাহরণ কাজী মোহাম্মদ আ. হাদীদ। তিনি একজন বেসরকারি চাকুরে। অফিসের কাজ শেষে তিনি প্রায়ই মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন, অর্থাৎ রাইড শেয়ার করেন। তিনি গত বছরের ২৪ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর বনানীতে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন।
মামলার এজাহারে লেখা হয়েছে, যাত্রী নামানোর পর কাজী মোহাম্মদ আ. হাদীদ বনানী মাঠের কাছে একটি জায়গায় মূত্রত্যাগ করতে গেলে চারজন তাঁকে ঘিরে ধরেন এবং ছুরিকাঘাতের ভয় দেখিয়ে মুঠোফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেন। এ সময় তাঁকে মারধর করা হয়।
আ. হাদীদ বলছিলেন, এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় তাঁর টাকা খোয়া গেছে, তিনি আহত হয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন, মোটরসাইকেলের কাগজপত্র তুলতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন, মুঠোফোন ফেরত পেতে টাকা ব্যয় করতে হয়েছে এবং তিনি এখনো কর্মহীন।
আ. হাদীদ গতকাল সোমবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় চিৎকার করলে তিনি ও জনতা মিলে দুজনকে ধরে ফেলেন। এ সময় একটি হাতে আঘাত পান তিনি। তাঁর মুঠোফোনটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। কিন্তু মানিব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যান দুজন।
হাতে আঘাত পাওয়ার কারণে মাসখানেক কাজে যেতে পারেননি উল্লেখ করে আ. হাদীদ বলেন, তাঁর কারণে নির্মাণ প্রকল্প থামিয়ে রাখা যায় না বলে অফিস নতুন লোক নিয়েছে। মুঠোফোনটি আদালতে জব্দ ছিল। সেটি ছাড়িয়ে নিতে আইনজীবীর পেছনে সাড়ে চার হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। মোটরসাইকেলের কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স তিনি এখনো তুলতে পারেননি। আঙুলের ছাপ না মেলা–সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েছেন।
আ. হাদীদ বলছিলেন, এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় তাঁর টাকা খোয়া গেছে, তিনি আহত হয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন, মোটরসাইকেলের কাগজপত্র তুলতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন, মুঠোফোন ফেরত পেতে টাকা ব্যয় করতে হয়েছে এবং তিনি এখনো কর্মহীন।
বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ৯৩৫টি, যা আগের বছরের চেয়ে ৩৭ শতাংশ বেশি। ডাকাতির মামলা হয়েছে ৭০২টি। আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। চুরির মামলা বেড়েছে ১২ শতাংশ (৯ হাজার ৬৭২টি)। অন্যদিকে অপহরণের মামলা বেড়েছে ৭১ শতাংশ (১ হাজার ১০১টি)।
সব মিলিয়ে চার ধরনের অপরাধে মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ৪১০টি, যা আগের বছরের চেয়ে ১৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেশি। শুধু ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। অবশ্য চুরি ও ছিনতাই বা দস্যুতার অনেক ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলার ঝামেলায় যেতে চান না। সেই প্রবণতা আগেও ছিল, এখনো আছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে দেশে অপরাধের চিত্র প্রায় একই রকম। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি বা অপহরণের মামলা গত বছরের তুলনায় বাড়লেও সামগ্রিকভাবে অন্যান্য অপরাধও বেড়েছে, এমনটা নয়। মামলা বাড়ার একটি বড় কারণ, এখন মামলা করা সহজ হয়েছে, মানুষ সহজেই থানায় গিয়ে মামলা করতে পারছেন। এ ছাড়া আগে ঘটেছে, এমন ঘটনায় নতুন করে মামলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে চার ধরনের অপরাধে মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ৪১০টি, যা আগের বছরের চেয়ে ১৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেশি। শুধু ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। অবশ্য চুরি ও ছিনতাই বা দস্যুতার অনেক ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলার ঝামেলায় যেতে চান না। সেই প্রবণতা আগেও ছিল, এখনো আছে।
শাহাদাত হোসাইন বলেন, দেশে মোট মামলার সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে। এমনকি খুনের মামলাও কমেছে। এর অর্থ হচ্ছে দেশে অপরাধের চিত্রটা কমবেশি একই রকম।
অবশ্য পুলিশের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বলছে, বিভিন্ন ধরনের অপরাধে ২০২৫ সালে মোট মামলা ৯ হাজার ৭৩২টি বেড়েছে। মামলা হয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৭৩৭টি।
২০২২ থেকে ২০২৫ সময়ে দেখা যায়, চুরির ঘটনায় মামলার প্রবণতা মোটামুটি একই রকম। তবে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণের মামলা।
নাগরিকদের মধ্যেও নিরাপত্তাবোধহীনতা তৈরি হয়েছে। রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন নিয়মিত বরিশালে গ্রামের বাড়িতে যাতায়াত করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখন বাস টার্মিনালে যেতে ভোরবেলা বের হতে ভয় করে। আবার রাতের বাসে ঢাকা ফিরে ভোরে নেমে বাসায় যেতে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ার শঙ্কা বোধ করেন তিনি।
প্রথম আলোর উদ্যোগে করা কিমেকার্স কনসাল্টিং লিমিটেডের এক মতামত জরিপে গত মাসে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে সরকার ব্যর্থ বলে মনে করেন ৬০ শতাংশ মানুষ। ৩৯ শতাংশ মনে করেন, সরকার সফল। ১ শতাংশ বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত নন।
এদিকে আইনশৃঙ্খলার নতুন সংকট ‘মব সন্ত্রাস’। আসকের হিসাবে, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছিলেন অন্তত ১২৮ জন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে খুনের ঘটনায় ৩ হাজার ৭৮৬টি মামলা হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৩৫৪টি বেশি। খুনের মামলার হিসাব দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ উল্লেখ করেছে, কিছু মামলা আগের ঘটনার। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় বেশ কিছু মামলা পরে হয়েছে।
তবে উদ্বেগজনক অনেক খুনের ঘটনাও ঘটছে। গত ডিসেম্বর মাসে খুন হন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদি। হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে তাঁর সহযোগীদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার (১১ ডিসেম্বর) পর এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক খুনের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১৫টি। বিগত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংকলিত হিসাবে, রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৯৮ জন।
‘রাজনৈতিক খুনের’ বাইরে আলোচিত ঘটনার মধ্যে রয়েছে ঢাকার মোহাম্মদপুরে মা ও মেয়ে হত্যার ঘটনা। গত ৮ ডিসেম্বর মোহাম্মদপুরে মা লায়লা আফরোজা (৪৮) ও মেয়ে নাফিসা নাওয়াল বিনতে আজিজকে (১৫) হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নারী গৃহকর্মী আয়েশা ও তাঁর স্বামী রাব্বীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ বলছে, চুরির ঘটনা দেখে ফেলায় মা ও মেয়েকে হত্যা করেন ওই নারী।
এদিকে আইনশৃঙ্খলার নতুন সংকট ‘মব সন্ত্রাস’। আসকের হিসাবে, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছিলেন অন্তত ১২৮ জন।
অপহরণের মামলা বেড়েছে। পুলিশের হিসাবে, ২০২৫ সালে অপহরণের মামলা বেড়েছে ৭১ শতাংশ। মামলা হয়েছে ১ হাজার ১০১টি। পুলিশ কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকদের ধারণা, সাম্প্রতিক কালে মানুষকে ধরে নিয়ে অথবা আটকে রেখে টাকা নেওয়ার ঘটনা বেশি ঘটছে। কক্সবাজারের টেকনাফেও অপহরণের ঘটনা বেশি।
সমাজে নানা ধরনের অপরাধী সক্রিয় আছে। এর মধ্যে অভ্যাসগত অপরাধীরা যত বেশি সুযোগ পায়, তত বেশি অপরাধ করে। সুযোগ বুঝে তারা লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে তিন দিন পুলিশি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এরপর ধীরে ধীরে পুলিশের সক্রিয়তা ও তৎপরতা বাড়ে। কিন্তু বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, অপরাধী ও বিশৃঙ্খলা দমনে পুলিশের শক্তিশালী ভূমিকা নেই। অনেকেই মনে করেন, পুলিশের মনোবল ও তৎপরতা স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও অনেক ঘটছে। গতকালই চট্টগ্রামে অভিযানে গিয়ে নিহত হন এক র্যাব সদস্য। ২০২৫ সালে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয় ৬০১টি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ প্রথম আলোকে বলেন, সমাজে নানা ধরনের অপরাধী সক্রিয় আছে। এর মধ্যে অভ্যাসগত অপরাধীরা যত বেশি সুযোগ পায়, তত বেশি অপরাধ করে। সুযোগ বুঝে তারা লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে। তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন নাজুক অবস্থায় আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো ঠিকমতো ‘ফাংশন’ করছে না। ফলে অপরাধীরা বেশি সুযোগ পাচ্ছে। এ কারণে অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।