ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোস্তফা আরিফুজ্জামান আরিফের স্কুলশিক্ষক বাবা প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। তিনি বলছেন, আরিফুজ্জামান মাদকসহ ধরা পড়েছেন, তাঁকে আদালতে চালান দেওয়া হবে—পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্য পরিচয়ে এমন ভয় তাঁকে দেখানো হয়। তাঁর কাছে টাকা দাবি করা হয়। তিনি ছেলের কথা ভেবে মুঠোফোনের মাধ্যমে দেড় লাখ টাকা দেন। পরে বুঝতে পারেন, প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
আরিফুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে। তাঁর গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার নামে ভুয়া তথ্য দিয়ে, আমার কণ্ঠ নকল করে একটি প্রতারক চক্র বাবার কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।’
আরিফুজ্জামানের বাবা মোস্তফা রুহুল কুদ্দুস সাতক্ষীরার ঘোনা ইউনিয়ন বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। এই ঘটনায় তিনি সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। সাতক্ষীরা সদর থানার পুলিশ বলছে, জিডিতে কিছু তথ্যের ঘাটতি আছে। সেগুলো পেলে তারা কাজ শুরু করবে। এই ধরনের প্রতারক চক্রকে ধরা খুবই কঠিন।
‘টাকা দিতে হবে...অন্যথায়’
রুহুল কুদ্দুস প্রথম আলোকে বলেন, ২১ মে দুপুরে একটা নম্বর থেকে তাঁর মুঠোফোনে কল আসে। তাঁকে বলা হয় ‘আপনার কয় ছেলে?’ জবাবে তিনি বলেন, ‘দুই ছেলে।’ তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আপনার ছেলেরা কী করে?’ তিনি বলেন, ‘বড় ছেলে চাকরি করে। ছোট ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে।’
ছোট ছেলে আরিফুজ্জামান কোথায় থাকেন, কী করেন, কার সঙ্গে মেশেন—সেই খবর রাখেন কি না, এমন সব প্রশ্ন মুঠোফোনের অপর প্রান্ত থেকে করা হয় বলে উল্লেখ করেন রুহুল কুদ্দুস। তিনি বলেন, তাঁকে বলা হয়, ‘আপনার ছেলে তো মাদকের সঙ্গে জড়িত। সে মাদকসহ ধরা পড়েছে। সাথে আরও তিনজন।...আপনার ছেলে এখন আমাদের হেফাজতে।’
রুহুল কুদ্দুস বলেন, তাঁকে মুঠোফোনে কল করা ব্যক্তি নিজেকে ‘ডিবির সদস্য’ বলে পরিচয় দেন। তাঁর কথা শুনে রুহুল কুদ্দুস ভয় পেয়ে যান। তিনি তাঁকে বলেন, ‘আমার ছেলে তো কখনো সিগারেটও খায়নি, এসবের সঙ্গেও জড়িত না।’ তখন তাঁকে হুমকি দিয়ে বলা হয়, ‘আমরা যেহেতু আটক করেছি, তাঁকে চালান করে দেব। শুনেছি, আপনি শিক্ষক মানুষ। আপনার ছেলেও কান্নাকাটি করে বলছে, যদি তাঁকে চালান দেওয়া হয়, এ ঘটনা জানাজানি হয়, তাহলে সে (আরিফুজ্জামান) আত্মহত্যা করবে।’
রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমি অনুরোধ করে বলি, ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।’ ফোনের ওপাশ থেকে বলা হয়, সে জন্য তো একটা প্রক্রিয়া আছে। নেন, আপনার ছেলের সঙ্গে কথা বলেন।’
তখন মুঠোফোনের অপর পাশ থেকে একটি কণ্ঠ শোনানো হয় বলে উল্লেখ করেন রুহুল কুদ্দুস। তিনি বলেন, কণ্ঠটি শুনতে অনেকটা তাঁর ছেলের মতো ছিল। কান্নাকাটি করে বলছিল, ‘আমাকে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। আমাকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করো।’
রুহুল কুদ্দুস বলেন, পরে তাঁকে বলা হয়, ‘আপনার সম্মানের দিকে তাকিয়ে আমরা তাঁকে ছেড়ে দেব। কিন্তু এক লাখ টাকা দিতে হবে এখনই। অন্যথায় আপনার ছেলেকে আমরা রিমান্ডে নেব। মাদক মামলায় তাঁর জেলও হবে।’
রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘তখন আমি কী করব ভেবে না পেয়ে ছেলেকে বাঁচানোর জন্য ওদের দেওয়া মুঠোফোন নম্বরে এক লাখ টাকা পাঠাই। টাকা পাওয়ার পর বলা হলো, ‘আপনি অনেক দেরি করে ফেলেছেন। এখানে সাংবাদিকেরাও জড়ো হয়ে গেছে।...এখন আরও এক লাখ টাকা দিতে হবে। তারপর আমি আরও ৫০ হাজার টাকা পাঠাই।’
ইতিমধ্যে পরিবারের লোকজন বিষয়টা স্কুলের অন্য শিক্ষকদের জানান বলে উল্লেখ করেন রুহুল কুদ্দুস। তিনি বলেন, ‘তাঁরা (অন্য শিক্ষকেরা) আমাকে খুঁজে বের করেন। তাঁরা জানান যে আমার ছেলে ঠিকঠাক আছে। আমি প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েছি। কিন্তু আমি তো ব্যাপারটি বোঝার আগেই প্রতারক চক্রকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দিয়েছি।’
সাধারণ ডায়েরি
প্রতারণার শিকার হয়েছেন বুঝতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে সাতক্ষীরা সদর থানায় যান বলে উল্লেখ করেন রুহুল কুদ্দুস। তিনি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তিনি বলেন, যে নম্বর থেকে কল এসেছে, হুমকি দেওয়া হয়েছে, টাকা পাঠানো হয়েছে—সেসব তথ্য জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা সদর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক (এসআই) সৈকত পাড়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতারণার অভিযোগে একটা জিডি হয়েছে। জিডিতে ফোন নম্বর উল্লেখ আছে। কিন্তু আরও কিছু দরকারি তথ্য—যেমন কখন টাকা পাঠানো হয়েছে, কোন জায়গা থেকে পাঠানো হয়েছে, এগুলো জিডিতে উল্লেখ নেই। এগুলো পেলেই আমরা কাজ শুরু করে দেব।’
এভাবে প্রতারণার ঘটনা এখন প্রায়ই ঘটছে বলে উল্লেখ করেন এসআই সৈকত পাড়ে। তিনি বলেন, প্রতারকেরা এই কাজ করতে যে সিম ব্যবহার করে, তা নকল হয়ে থাকে। এনআইডি দিয়ে সিম রেজিস্ট্রেশন করা থাকে ঠিকই। কিন্তু দেখা যায়, এনআইডির মালিক মারা গেছেন। কিংবা তাঁর বয়স ৭০-৮০ বছর। তিনি জানেও না যে তাঁর এনআইডি দিয়ে সিম চালু করে প্রতারণা চলছে। প্রতারকেরা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এমনভাবে চালায়, যেন সিম বন্ধ থাকে, কিন্তু অ্যাপস চলে। টাকা একবার প্রতারকের হাতে চলে গেলে সব সময় তা উদ্ধার করা সম্ভব হয় না।