বাসা থেকে গ্রেপ্তারের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) গাড়িতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী
বাসা থেকে গ্রেপ্তারের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) গাড়িতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ

এক-এগারোর দায় অন্যদের ওপর চাপাচ্ছেন মাসুদ উদ্দিন

জিজ্ঞাসাবাদে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ২০০৭ সালে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে নিজে দায় এখনো স্বীকার করেননি। পাশাপাশি এক-এগারোর সময় বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের দায়ও অন্যদের ওপর চাপিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে।

সূত্রগুলো বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন দাবি করেন, ২০০৭ সালে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন। তাঁকে নির্যাতনের ঘটনা তখনকার একজন পরিচালকের নেতৃত্বে ঘটেছে। তিনি তখন সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ছিলেন।

এক-এগারোর অন্যতম প্রধান কুশীলব হিসেবে পরিচিত মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে মানব পাচার–সংক্রান্ত একটি মামলায় রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) হেফাজতে আছেন।

সংশ্লিষ্ট একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন বলেন, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির দিন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের সঙ্গে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী প্রধান এবং ডিজিএফআইয়ের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, তিনি (মাসুদ উদ্দিন) ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা) পরে বঙ্গভবনে চা–চক্রে যোগ দেন। তার আগেই জরুরি অবস্থা জারি করতে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর হয়ে যায়। তখন দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা না হলে দেশে গৃহযুদ্ধ লেগে যেত বলেও দাবি করেন।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গত সোমবার রাতে ঢাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পল্টন থানার মামলায় মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি। এরপর ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গত বুধবার গ্রেপ্তার করে ডিবি। মিরপুর থানার একটি হত্যা মামলায় আদালত তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ডিবি হেফাজতে তাঁকেও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। গতকাল তাঁর রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন অতিবাহিত হয়েছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, মাসুদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে মানব পাচার প্রতিরোধ আইনের মামলাটি ডিবি তদন্ত করছে। এই মামলায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গতকাল শনিবার তাঁর রিমান্ডের চতুর্থ দিন পার হয়েছে। আজ রোববার তাঁকে আদালতে তোলা হবে। তাঁর বিরুদ্ধে আরও ১০টি মামলা রয়েছে ঢাকা ও ফেনীতে।

সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, মানব পাচার মামলার পাশাপাশি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে এক-এগারোর সময়কার ভূমিকার বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। যেমন ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা চালুর পরিকল্পনা কোথায় হয়েছিল, এতে কারা সমর্থন জুগিয়েছে, কোন কোন গোয়েন্দা সংস্থা ও বহির্বিশ্বের কারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, ইত্যাদি বিষয়েও জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশে জনশক্তি রপ্তানিতে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। এই সিন্ডিকেট জনশক্তি রপ্তানিতে বৈধ লাইসেন্সধারী অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বঞ্চিত করে বিদেশগামী শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিয়েছিল। মাসুদ উদ্দিনের প্রতিষ্ঠানও এই সিন্ডিকেটে যুক্ত ছিল। এ বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাসুদ উদ্দিনের শক্তির উৎস সম্পর্কেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার আরও জানান, রিমান্ডে থাকা আরেক সাবেক সেনা কর্মকর্তা শেখ মামুন খালেদকে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মামলার বিষয়েই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ক্ষমতা ব্যবহার করে অপরাধ করার সক্ষমতা তাঁর ছিল। এসব বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে জানতে চাওয়া হবে।