ঢাকার সাভারে একে একে ছয়টি খুনের অভিযোগে মশিউর রহমান ওরফে সম্রাট (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করার পর অনেকের মনে ফিরে আসছে রসু খাঁর নাম। ১৮ বছর আগে ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছিলেন রসু খাঁ। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তিনি একে একে ১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছিল। এর মধ্যে ১১ বছর আগে চাঁদপুরে এক পোশাকশ্রমিককে হত্যার দায়ে রসু খাঁর ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। এই মৃত্যুদণ্ডাদেশ হাইকোর্টও বহাল রাখে। তবে ফাঁসির সেই আদেশ এখনো কার্যকর হয়নি। রসু খাঁ এখন গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সেলে আছেন।
গত রোববার ঢাকার অদূরে সাভারে পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টার ও আশপাশ থেকে গত ছয় মাসে ছয়টি লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মশিউর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর রসু খাঁর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
চাঁদপুরে আলোচিত পারভীন হত্যা মামলায় দুই বছর আগে হাইকোর্ট রসু খাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন। ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অপর দুই আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁরা হলেন রসু খাঁর ভাগনে জহিরুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগী মো. ইউনুছ। বিচারিক আদালতের রায়ে রসু খাঁসহ এই তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। চাঁদপুরের আদালত এই রায় দিয়েছিলেন ২০১৮ সালের ৬ মার্চ।
রসু খাঁর সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে গাজীপুরের কাশিমপুরের হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক আবদুল্লাহ আল মামুন গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ফাঁসির আদেশ পাওয়া রসু খাঁকে (৫২) কিছুদিন আগে কুমিল্লার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের পাঠানো হয়। তিনি ফাঁসির আসামিদের সেলে আছেন।
রসু খাঁ সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন জানিয়ে এই কারা কর্মকর্তা বলেন, কারাগারে কয়েদিদের বাইরের থেকে আনা খাবার গ্রহণ করা হয় না। রসু খাঁকেও কারাগারের রান্না হওয়া খাবারই খেতে হয়। তবে কোনো স্বজন এই কারাগারে রসু খাঁকে দেখতে এখনো আসেননি।
এর আগে কথা হয় কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক হালিমা খাতুনের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রসু খাঁসহ তিনজন এই কারাগারের যে ভবনে ছিলেন, সেই ভবন ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা হবে। সে জন্য তাঁদের কিছুদিন আগে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়। নতুন ভবন নির্মিত হলে তাঁদের আবার কুমিল্লার কারাগারে ফিরিয়ে আনা হবে।
হালিমা খাতুনও বলেন, রসু খাঁকে মানসিকভাবে শক্তই দেখেছেন তিনি।
এই কারা কর্মকর্তা বলেন, ফাঁসির আসামি রসু খাঁ ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত তাঁর ভাগনেসহ তিনজনের বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের আবেদন (লিভ টু আপিল) করা হয়েছে।
২০০৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর সদর উপজেলার সোবহানপুর গ্রামের ডাকাতিয়া নদীর পাড় থেকে শাহিদা আক্তার (১৯) নামের এক তরুণীর হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই সময় চাঁদপুর মডেল থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন।
চাঁদপুর সদরের মদনা গ্রামের বাসিন্দা রসু খাঁ ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর ওই গ্রামে মসজিদের ফ্যান চুরির মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর জবানিতে একের পর এক রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের তথ্য বেরিয়ে আসে।
মামলার বিবরণ ও আদালত সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ কর্মকর্তাদের তিনি বলেন, ২০০৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর খুলনার দৌলতপুরের কলমচর গ্রামের পোশাকশ্রমিক শাহিদা আক্তারকে (১৯) বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কৌশলে চাঁদপুরে এনে ধর্ষণের পর হত্যা করেন তিনি।
২০০৯ সালের ২০ জুলাই চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানার হাসা খালের দক্ষিণ পাশে পারভীন নামের এক নারীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করার কথাও পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেন রসু খাঁ।
১১ জন নারীকে প্রেমের অভিনয় করে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের পর হত্যার স্বীকারোক্তি দেন রসু খাঁ। এর মধ্যে ফরিদগঞ্জে ছয়টি, চাঁদপুর সদরে চারটি ও হাইমচরে একটি। রসু যাঁদের হত্যা করেছেন, তাঁরা সবাই ছিলেন ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পোশাককর্মী।
জিজ্ঞাসাবাদে রসু খাঁ পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, ভালোবাসায় ব্যর্থ হয়ে তিনি একসময় ক্রমিক খুনি হন। জিজ্ঞাসাবাদে রসু খাঁ পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, তাঁর লক্ষ্য ছিল (টার্গেট) ১০১টি হত্যাকাণ্ড ঘটানো।
চাঁদপুর সদর উপজেলার মদনা গ্রামের খাঁ বাড়ির বাসিন্দা রসু খাঁ। ছোটবেলা থেকেই চুরিতে জড়িত হওয়ায় ‘ছিঁচকে চোর’ হিসেবে স্থানীয়দের মধ্যে পরিচিত পান তিনি। একপর্যায়ে তাঁর স্বভাবচরিত্র খারাপ দেখে গ্রামবাসী তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন।
তখন রসু খাঁ আশ্রয় নেন গাজীপুরের টঙ্গীতে। সেই থেকে শুধু চুরি, ডাকাতি, গুন্ডামি, ভাড়ায় মাস্তানি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডই নয়, বিভিন্ন নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি।
রসু খাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, টঙ্গীতে এক নারী পোশাকশ্রমিকের সঙ্গে প্রেম করতে গিয়ে ধরা পড়ে গণপিটুনির শিকার হওয়ার পর তিনি শপথ নিয়েছিলেন, ১০১ নারীকে হত্যা করে তারপর মাজারে গিয়ে তওবা করে ভালো হয়ে যাবেন। কিন্তু তার আগেই মসজিদের ফ্যান চুরির ঘটনায় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যান।