মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার একটি ধানখেতে পড়ে ছিল এক তরুণের মাথাবিহীন লাশ। পরিচয়হীন ওই তরুণ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারছিলেন না আশপাশের বাসিন্দাদের কেউ। তবে তাঁর পকেটে থাকা একটি কাগজ নানা প্রশ্ন তৈরি করে। সেটি ছিল নাটোরের আদালতে করা একটি মামলার কাগজ।
মামলার এই কাগজ কী ভুক্তভোগীর, নাকি খুনির রেখে যাওয়া ইঙ্গিত, নাকি ফাঁদ—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তদন্তকারীদের কেটে যায় ছয় মাস।
পুলিশ মামলার কাগজ ধরেই শুরু করেছিল তদন্ত। মামলাটি করা হয়েছিল হত্যাকাণ্ডটির মাত্র আট দিন আগে। মামলার কাগজ অনুযায়ী বাদীর বাড়ি নাটোরে। তবে মামলায় যাঁদের আসামি করা হয়েছে, তাঁদের বাড়ি ঘটনাস্থলের কাছে। অর্থাৎ মুন্সিগঞ্জ সদরে। কিন্তু তাঁদের কেউ এই হত্যার সঙ্গে জড়িত নন। হত্যাকারী হিসেবে যাঁকে পাওয়া গেল, তিনি মুন্সিগঞ্জেরই বাসিন্দা। তবে তাঁর সঙ্গে খুন হওয়া তরুণের কোনো বিরোধ ছিল না। তা ছাড়া ঘটনার সময় তিনি ভারতে অবস্থান করছিলেন বলে কাগজপত্র প্রমাণ দিচ্ছিল। কিন্তু শফি কাজী নামের ওই ব্যক্তি জমিজমা নিয়ে বিরোধ থেকে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে পরিকল্পনা সাজিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসে।
তরুণকে হত্যার এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার সময় আসামির পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন তথ্য অনুযায়ী তিনি ভারতে অবস্থান করছিলেন। তদন্তে বেরিয়ে আসে, তিনি অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে এসে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আবার একই পথে ভারতে ফিরে যান। এর প্রায় এক মাস পরে বৈধ পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ফলে কেবল দালিলিক প্রমাণ নয়, বরং অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
খুনি ধরা পড়ে যেভাবে
খুনের ঘটনাটি ঘটে ২০১৭ সালের ৩ নভেম্বর। পরদিন ৪ নভেম্বর সকালে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার শিলই গ্রামের নুরু মোল্লার ধানখেত থেকে লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত তরুণ (২২ বছর) ছিলেন প্রতিবন্ধী। প্রায় দুই বছর তিনি মুন্সিগঞ্জ এলাকায় ভবঘুরে হিসেবে ঘুরে বেড়াতেন।
থানা-পুলিশ ছয় মাস এই মামলার তদন্ত করে রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় ২০১৮ সালের ১৫ মে মামলাটির তদন্তভার যায় পিবিআইয়ের হাতে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করে জট। গত জানুয়ারিতে পিবিআই সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শিরোনামে প্রকাশিত বইয়ে এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
লাশের পকেটে থাকা মামলার কাগজ ধরে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তারা নাটোরে গিয়ে মামলার বাদীর কোনো অস্তিত্ব পাননি। কাগজে আসামি হিসেবে মুন্সিগঞ্জের যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়, তাঁদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তকারীরা। তাতেও মাথাবিহীন লাশের কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না।
এবার আসামিদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, নাটোরে তাঁদের কোনো প্রতিপক্ষ আছে কি না। তাঁরা জানান, নাটোরে তাঁদের কোনো প্রতিপক্ষ নেই। তবে স্থানীয়ভাবে জমি নিয়ে তাঁদের বিরোধ আছে। তাঁরা এ সময় কয়েকজনের বিষয়ে তথ্য দেন। যাঁদের বিষয়ে তথ্য দেন, তাঁদের মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে শুরু হয় প্রযুক্তিগত তদন্ত। দেখা যায়, নাটোরে মামলাটি দায়েরের সময় এই তালিকার একজনের অবস্থান সেখানে ছিল। তিনি শফি কাজী। তাঁর বাড়ি মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলায়।
এরপর শফি কাজীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তকারীরা। শফি কাজী দাবি করেন, ঘটনার সময়ে তিনি ভারতে ছিলেন। সে সময় তাঁর ভারতে অবস্থানের পক্ষে কাগজপত্রও তুলে ধরেন। কিন্তু প্রযুক্তিগত তদন্তে দেখা যায়, নাটোরের আদালতে মামলা দায়ের এবং মুন্সিগঞ্জে তরুণকে হত্যা—এই দুই ঘটনার সময়ই শফি কাজীর মুঠোফোনের অবস্থান দুই জায়গাতেই ছিল।
এবার আরও নিবিড়ভাবে অনুসন্ধান শুরু করেন তদন্তকারীরা। তাতে বেরিয়ে আসে, শফি কাজীর সঙ্গে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি এলাকার লালু কসাই নামের এক ব্যক্তির যোগাযোগ আছে। এবার এই কালু কসাইকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তিনি জানান, শফি কাজীকে অবৈধভাবে ভারতের সীমান্ত পারাপারে সহায়তা করেছিলেন তিনি। এ তথ্যের পর শফি কাজীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে মাথাবিহীন তরুণ হত্যার রহস্য।
একের পর এক তথ্য সামনে আসার পর শফি কাজী ভেঙে পড়েন। পুরো ঘটনার বিবরণ দেন তদন্তকারীদের কাছে। তিনি বলেন, ঘটনার আগে শফি কাজী যশোরের হিলি দিয়ে বৈধভাবে ভারতে যান। কিছুদিন পর কসাই লালুর সহায়তায় জয়পুরহাট সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে এসে নাটোরের আদালতে মামলা করেন। তবে ওই মামলায় বাদী হিসেবে নিজের নাম–পরিচয় উল্লেখ করেননি। নাটোরের এক বাসিন্দার নাম–পরিচয় দেন, যার অস্তিত্বই নেই। এরপর গোপনে মুন্সিগঞ্জে এসে তরুণকে খুন করে সেই মামলার কাগজ তাঁর পকেটে রেখে দেন। এরপর আবার জয়পুরহাট সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে তিনি ভারতে যান। এক মাস পর তিনি বৈধ পথে দেশে আসেন। অর্থাৎ নথিপত্রে ভারতে অবস্থানের কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি দেশে ঢুকে ভুয়া মামলা করেন এবং খুনের মিশন বাস্তবায়ন করেন। মূলত জমিজমার বিরোধ থেকে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে তিনি এই ভয়ংকর খুনের পরিকল্পনা করেন।
পিবিআই সূত্র জানায়, ২০১৮ সালেই এই মামলায় শফি কাজী ও তাঁর সহযোগী লালু কসাইকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। মামলাটি এখনো মুন্সিগঞ্জের আদালতে বিচারাধীন।
জমি ফিরে পেতে ভয়ংকর এই পরিকল্পনা
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে, শফি কাজীর দখলে থাকা একটি জমি বেদখল হয়ে গেলে তিনি ক্ষুব্ধ হন। ওই জমি পুনর্দখল এবং প্রতিপক্ষকে হয়রানি করতে তিনি পরিকল্পিতভাবে একজন নিরীহ ভবঘুরে ব্যক্তিকে হত্যা করেন। পরে প্রতিপক্ষকে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ফাঁসাতে তাঁদের বিরুদ্ধে অন্য জেলায় ওই মিথ্যা মামলা করেন। সেই মামলার নথির ফটোকপি নিহত তরুণের পরা থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্টের পকেটে গুঁজে দেওয়া হয়, যাতে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ত দেখানো যায়।