
রাজধানীর পল্টনে একটি মানবাধিকার সংস্থার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আলী হাসান আসকারি নামের এক ব্যক্তি। সেখানে তিনি নিজেকে নবাব সলিমুল্লাহর নাতি হিসেবে পরিচয় দেন। ওই অনুষ্ঠানে ছিলেন গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার মাজুখানের বাসিন্দা তাজুল ইসলামও।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আসকারীর ছবি দেখে তাঁর ওপর বিশ্বাস জন্মায় তাজুলের। পরে একদিন তাজুলকে আসকারি জানান, সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে তাঁর বাবার মালিকানা রয়েছে। ওই হাসপাতালে ৫০০ পদে লোক লাগবে। যাঁরা যাবেন, তাঁদের খরচ দিতে হবে না। শুধু স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ১০ হাজার টাকা দিলেই হবে।
তাজুল তাঁর ভাই, বোন, আত্মীয়স্বজনসহ পাড়া–প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা নিয়ে আসকারিকে দেন। পরে আসকারি আরও টাকা দিতে বললে তাজুলের সন্দেহ হয়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এরপর ২০২০ সালের ৩১ অক্টোবর আসকারীর বিরুদ্ধে রাজধানীর তুরাগ থানায় একটি প্রতারণার মামলা করেন তাজুল। তবে টাকা ফেরত পাননি।
পুলিশ বলছে, আলী হাসান আসকারির প্রকৃত নাম কামরুল হাসান ওরফে হৃদয় (৫১)। তিনি একজন প্রতারক। তদন্তে দেখা গেছে, তিনি নবাব সলিমুল্লাহর ছেলে নবাবজাদা আল আমানউল্লাহ আসকারিকে বাবা এবং আমানউল্লাহর স্ত্রী সাহেরা হেনা আসকারিকে মা বলে পরিচয় দিতেন। পুরান ঢাকার আহসান মঞ্জিলকে নিজের ঠিকানা বলে উল্লেখ করতেন। এই সব তথ্য দিয়ে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রও বানিয়েছেন।
পুলিশ বলছে, পুরান ঢাকার ইসলামপুরে একটি কাপড়ের দোকানের এক বিক্রয়কর্মীর ঘরে পালক সন্তান হিসেবে বড় হন নবাবের কথিত নাতি।
শুধু নবাবের বংশধর পরিচয় দিয়ে প্রতারণাই নয়। কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে আরও নানা কৌশলে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ বলছে, কখনো তিনি বলতেন দুবাইয়ে তাঁর সোনার ব্যবসা রয়েছে। তাঁর বাবা ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। আর তিনি নিজে থাকেন নেদারল্যান্ডসে। আবার কখনো ইউরোপে পাঠানোর কথা বলেও অর্থ আত্মসাৎ করতেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক কর্মীর নাম ভাঙিয়েও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
একের পর এক অভিযোগ আসতে থাকলে ২০২০ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) সদস্যরা কামরুল হাসানকে গ্রেপ্তার করেন। সিটিটিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে মোট তিনটি মামলা রয়েছে। দুই বছর জেল খেটে গত বছরের অক্টোবরে তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
মামলাগুলোর তদন্ত কর্মকর্তা সিটিটিসির উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুর রহমান। গাজীপুরের তাজুল ইসলামের করা মামলাটি বাদে অন্য মামলা দুটি করেন ফেনীর আবদুল আহাদ সালমান ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইব্রাহিম আলী ওরফে সাগর। সালমানের করা মামলায় কামরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে চারজন কর্মকর্তা মামলাগুলো তদন্ত করেছেন।
কামরুল পুলিশের কাছে যেসব ঠিকানা দিয়েছেন, তার সবগুলোই ভুয়া। পুলিশ জানতে পেরেছে, তিনি পুরান ঢাকার ইসলামপুরে একটি কাপড়ের দোকানের এক বিক্রয়কর্মীর ঘরে পালক সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠেন। গ্রেপ্তার হওয়ার বছর পাঁচেক আগে নবাবের নাতি হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। এ নিয়ে ফেসবুকে প্রচার-প্রচারণা চালান। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট লোকজনের সঙ্গে ছবি তুলে প্রকাশ করেন ফেসবুকে। এরপর বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিশানা করে প্রতারণা করতেন।
সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, নারায়ণগঞ্জে নবাব পরিবারের আসকারি জুট মিলটি দখলের পাঁয়তারা করছিলেন কামরুল।
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে কামরুল স্বীকার করেছেন, বিভিন্ন প্রতারণার কাজে তাঁর সহযোগী ছিলেন রাশেদ ওরফে রহমত আলী ওরফে রাজা, মীর রাকিব আফসার, সজীব ওরফে মীর রুবেল, আহাম্মদ আলী ও বরকত আলী ওরফে রানা। এর মধ্যে রাশেদ, আহাম্মদ ও বরকত আপন তিন ভাই। বড় ভাই আহাম্মদ কামরুলের ব্যবস্থাপক ছিলেন। রাশেদকে সাজানো হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। ছোট ভাই বরকত ছিলেন তাঁর দেহরক্ষী। রিমান্ডে তাঁরা কামরুলকে নিজেদের ভাই বলে উল্লেখ করেন। তবে কামরুল বলেছেন, ওই তিন ভাই তাঁর কর্মচারী ছিলেন।
কামরুলের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোর তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কামরুলের প্রকৃত পরিচয় জানার জন্য তাঁর ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করেছে পুলিশ। তাঁর সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া তাঁর ভাইদেরও ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন জানানো হয়েছে। ১৭ জুলাই ডিএনএ পরীক্ষা জন্য ধার্য তারিখে কামরুল হাজির না হওয়ায় ওই দিন এ বিষয়ে আদালত কোনো আদেশ দেননি।
সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, পুরান ঢাকার নবাব পরিবারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা করার সময় প্রতারক কামরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি নারায়ণগঞ্জে নবাব পরিবারের আসকারি জুট মিলটি দখলের পাঁয়তারাও করছিলেন।
ফেনীর রাশিদীয়া মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক আবদুল আহাদ সালমান মতিঝিল থানায় কামরুলের বিরুদ্ধে একটি প্রতারণা মামলা করেছিলেন। তাঁর বরাত দিয়ে মামলার তদন্ত–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে বলেন, ২০২০ সালের মার্চ-এপ্রিলে ফেসবুকে কামরুলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। কামরুল নিজেকে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর ফেসবুকে বিশিষ্ট লোকজনের সঙ্গে ছবি দেখে তা বিশ্বাস করে নেন সালমান। কামরুল জানান, তিনি সালমানের মাদ্রাসায় বিপুল অঙ্কের টাকা দান করতে চান।
একপর্যায়ে কামরুল সালমানকে জানান, সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে তাঁর বাবার মালিকানা রয়েছে। হাসপাতালে ওয়ার্ডবয়সহ ৫০০ কর্মী নিয়োগ করা হবে। এসব পদে কাজ করার জন্য বিনা খরচে লোকজনকে বিদেশে পাঠানো হবে। এরপর সামলানকে কিছু কর্মী দিতে বলেন কামরুল।
আবদুল আহাদ সালমান বলেন, আসকারীর কথা বিশ্বাস করে নিজের এলাকা থেকে সিঙ্গাপুর যেতে চায় এমন প্রায় ৪০০ জনকে সংগ্রহ করেন। তাঁদের পাসপোর্ট নেওয়ার পর বিষয়টি কামরুলকে জানালে তিনি বলেন সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। এ জন্য প্রত্যেকের সাড়ে আট হাজার টাকা করে খরচ হবে। এভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষার কথা বলে তাঁদের দুই দফায় মোহাম্মদপুরের ‘ঢাকা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে’ নিয়ে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন কামরুল। পরে প্রত্যেককে নার্সিং সনদ জোগাড় করতে বলেন তিনি।
আবদুল আহাদ সালমান তদন্ত–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বলেন, নার্সিং সনদ জোগাড় করতে না পেরে বিষয়টি তিনি কামরুলকে জানান। এ সময় কামরুল একজনের নম্বর দিয়ে বলেন তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) কর্মকর্তা, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। আসলে ওই ব্যক্তি ছিলেন কামরুলের প্রতারণার সহযোগী রাজু ওরফে রাশেদ। রাশেদকে ফোন দেওয়ার পর তিনি বিষয়টি গোপনে করে দিতে পারবেন জানিয়ে প্রত্যেক সনদের বিপরীতে ৭৫ হাজার টাকা চান।
সালমান পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেন, প্রথমে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলেও পরে রাজি হন তিনি। হাসপাতালে কাজ করতে ইচ্ছুক ওই ব্যক্তিদের কাছ থেকে ৭৫ হাজার করে টাকা নিয়ে তিনি মোট সোয়া তিন কোটি টাকা কামরুল ও রাশেদের হাতে তুলে দেন। এরপর থেকেই কামরুল টালবাহানা শুরু করেন। পরে সালমান বুঝতে পারেন, তিনি প্রতারিত হয়েছেন। কামরুল বলেন, ‘নবাব পরিবারের বংশধর হিসেবে আমি তাঁর সব কথাই বিশ্বাস করেছিলাম।’