আনোয়ারুল হত্যার তদন্ত থেমে আছে, সোনা চোরাচালানসহ নানা রহস্যজট খোলেনি

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশে হওয়া মামলার তদন্ত কার্যক্রম থেমে আছে।

মামলার নতুন তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলছে, ভারতের কলকাতা থেকে ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) প্রতিবেদন না পাওয়াসহ কিছু কারণে তদন্ত এগোচ্ছে না।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার মামলাটি প্রথমে তদন্ত করছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। গত ২৪ মে তদন্তের দায়িত্ব সিআইডিকে দেওয়া হয়।

তৎকালীন সংসদ সদস্য আনোয়ারুল গত বছরের ১২ মে ভারতে গিয়ে নিখোঁজ হন। ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার নিউটাউনের একটি ফ্ল্যাটে তিনি খুন হন।

এই ঘটনায় ভারতে একটি মামলা হয়। অন্যদিকে আনোয়ারুলের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস গত বছরের ২২ মে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি মামলা করেন।

নিউটাউনের ফ্ল্যাটটির সেপটিক ট্যাংক ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার একটি খাল থেকে কয়েক টুকরা মাংস, হাড় উদ্ধার হয়েছিল। এগুলো আনোয়ারুলের লাশের খণ্ডিত অংশ কি না, তা নিশ্চিত হতে গত বছরের নভেম্বরে কলকাতায় যান তাঁর মেয়ে মুমতারিন। তিনি ডিএনএ নমুনা দেন।

তৎকালীন সংসদ সদস্য আনোয়ারুল গত বছরের ১২ মে ভারতে গিয়ে নিখোঁজ হন। ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার নিউটাউনের একটি ফ্ল্যাটে তিনি খুন হন।

পরে কলকাতার গণমাধ্যমে খবর বের হয়, ডিএনএ মিলেছে। মরদেহের খণ্ডাংশগুলো আনোয়ারুলেরই। তবে কলকাতা পুলিশের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ডিএনএ প্রতিবেদন এখনো পায়নি বাংলাদেশের তদন্তকারী সংস্থা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মামলাটির তদন্ত একপ্রকারে থেমে যায়। বিশেষ পরিস্থিতিতে মামলার বাদীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। আবার এই মুহূর্তে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। ফলে তথ্য আদান-প্রদানসহ নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। এসব কারণে এখন এই মামলার তদন্ত শেষ করা সম্ভব নয়।

গ্রেপ্তার ৯

আনোয়ারুল হত্যার ঘটনায় দুই দেশে মোট ৯ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তাঁদের মধ্যে ভারতে দুজন, বাংলাদেশে সাতজন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ভারতের কারাগারে আছেন খুনে অংশ নেওয়া জিহাদ হাওলাদার ও সিয়াম হোসেন। বাংলাদেশের কারাগারে আছেন একসময়কার চরমপন্থী নেতা শিমুল ভূঁইয়া, তাঁর ভাতিজা তানভীর ভূঁইয়া, সহযোগী শিলাস্তি রহমান, মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও ফয়সাল আলী, ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম, একই কমিটির ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ। বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হওয়া সাইদুল ছাড়া অন্যরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

ডিবির তদন্তকালে খুনের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে আনোয়ারুলের বন্ধু আক্তারুজ্জামান ওরফে শাহীনের নাম উঠে এসেছিল। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ৫ কোটি টাকার বিনিময়ে খুনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন শিমুল।

রহস্যজট

আনোয়ারুল খুনের পর উভয় দেশের তদন্তে সোনা চোরাচালান নিয়ে বিরোধের বিষয়টি উঠে আসে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মামলার তৎকালীন তদন্ত সংস্থা ডিএমপির ডিবি আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি সামনে আনেনি।

কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া প্রতিবেদনসহ তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনায় এই বিষয়টি বিভিন্ন সময় উল্লেখ করেন তৎকালীন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পর ঝিনাইদহে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে সোনা চোরাচালান দ্বন্দ্বে আনোয়ারুলের খুন হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। এমনকি এই খুনের ঘটনায় দেশে যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁদের কেউ কেউ ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে সোনা চোরাচালানের বিষয়টি উল্লেখ করেন বলে তখন জানা যায়।

ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণে আনোয়ারুল খুন হয়েছেন, এটুকু নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে ব্যবসাটা সোনা চোরাচালান নাকি অন্য কিছু, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সিআইডির পরিদর্শক খান মো. এরফান, মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা

অন্যদিকে তদন্ত নেমে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশের কর্মকর্তারাও জানতে পারেন, আনোয়ারুল সোনা পাচারে জড়িত ছিলেন। তবে ঠিক কী উদ্দেশ্যে আনোয়ারুল খুন হয়েছেন, সে ব্যাপারে রাজ্য পুলিশের প্রাথমিক অভিযোগপত্রে কিছু বলা হয়নি।

বাংলাদেশে মামলাটির বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক খান মো. এরফান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণে আনোয়ারুল খুন হয়েছেন, এটুকু নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে ব্যবসাটা সোনা চোরাচালান নাকি অন্য কিছু, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’

সিআইডির সূত্রগুলো বলছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মামলাটির তদন্ত গতি হারিয়েছে। ফলে সোনা চোরাচালানসহ অন্য যেসব বিষয় হত্যার নেপথ্যের কারণ হিসেবে সামনে আসে, সেগুলো নিয়ে তদন্ত আর এগোয়নি। বিশেষ করে কীভাবে চোরাচালান হতো, কারা কারা করতেন, সেগুলো নিয়ে কোনো তদন্ত হয়নি বললেই চলে।

এ ছাড়া আনোয়ারুল কেন বিমানবন্দর দিয়ে ভারতে না গিয়ে সড়কপথে সীমান্ত দিয়ে গেলেন, সে প্রশ্নের উত্তরও মেলেনি। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললে এই মামলার রহস্যজট খুলবে বলে মনে করছেন আনোয়ারুলের ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মামলাটির তদন্ত একপ্রকারে থেমে যায়।

স্বজনদের ক্ষোভ

এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আনোয়ারুলের স্বজনেরা। তবে স্বজনদের কেউ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

আনোয়ারুলের স্বজনদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মামলাটিকে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। আদালত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য তারিখ দিচ্ছেন। কিন্তু তদন্তকারী সংস্থা প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে না। তারা কালক্ষেপণ করছে।

আক্তারুজ্জামানকে ফেরানোর উদ্যোগ নেই

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যমতে, কলকাতার যে ফ্ল্যাটে আনোয়ারুলকে হত্যা করা হয়, সেটি ভাড়া করেছিলেন আক্তারুজ্জামান। হত্যার ছক কষে তিনি আগেই দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে ঢাকা থেকে একটি ফ্লাইটে ভারতের নয়াদিল্লি হয়ে নেপালের কাঠমান্ডু চলে যান। সেখান থেকে দুবাই হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান তিনি। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব আছে। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে বাসা আছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আছেন।

কিন্তু এখন পর্যন্ত আক্তারুজ্জামানকে দেশে ফেরানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ বিষয়ে ডিবি ও সিআইডির কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। এ কারণে আক্তারুজ্জামানকে ফিরিয়ে আনতে প্রথমে ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সেই চেষ্টা বেশি দূর এগোয়নি। এই মুহূর্তে আক্তারুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক কোথায় আছেন, সে তথ্য বাংলাদেশের কাছে নেই।