পাঠকের লেখা–৭৭

অতীতের আমি, বর্তমানের আমি

প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: readers@prothomalo.com

তখন আমি গাজীপুরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফুল বিভাগে বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত ছিলাম। ২০০০ সাল। পেশাগত প্রশিক্ষণের জন্য শ্যামদেশ থাইল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ হলো। সেখানে যাওয়ার পর নানা রকম প্রশিক্ষণের ব্যস্ততার মধ্যেও চলছিল কেনাকাটা, বেড়ানো।

আমাদের গাইডের স্ত্রীর নাম ‘নি’। বাইরে কোথাও গেলে তিনি প্রায়ই আমার সঙ্গী হতেন।

একদিন ব্যস্ত ব্যাংকক নগরীতে মিনিবাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি আমি ও নি। চারপাশে বেশ ভিড়। মিনিবাস আসার সঙ্গে সঙ্গে সবাই উঠছে কিছুটা ঠেলাঠেলি করে। তবে আমাদের দেশে আমরা যে রকমভাবে উঠি, সে রকম নয়। আমিও পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে কিছুটা চেষ্টা করছি, কিন্তু নি নির্বিকার। ওকে ছাড়া উঠতেও পারছি না। অবশেষে আমরা দুজনই উঠলাম এবং ভাগ্যক্রমে সিটও পেলাম।

মিনিবাস কিছুক্ষণ চলার পর একজন বয়স্ক নারী উঠলেন, কিন্তু কোনো সিট নেই। বয়স্ক নারীকে দেখেই ‘নি’ উঠে তাঁকে বসতে দিল। কিছুক্ষণ পরে ওই নারী নেমে গেলে নি আবারও বসল।

কিছু দূর যেতেই আবার একজন বয়স্ক ভদ্রলোক উঠলেন। আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম যথারীতি নি আবারও উঠে দাঁড়াল এবং ভদ্রলোককে বসতে দিল। ভদ্রলোক নামার পরে আবারও নি বসল।

কলেজের গণ্ডি না পেরোনো থাই মেয়েটির মানবিকতা ও সাহসিকতা—দুটিই আমাকে মুগ্ধ করল। ভাবতে ভালো লাগল যে নি মেয়েটি নিজেকে একজন মেয়ে হিসেবে চিন্তা না করে একজন সুস্থ–কর্মক্ষম মানুষ হিসেবে ভাবতে পেরেছে, যা আমরা অনেক শিক্ষিত হয়েও পারছি না।

ভাষাগত সমস্যার কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নির কাছে আমার অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারিনি। কিন্তু বিষয়টি আমাকে কতটুকু আলোড়িত করেছিল, তা বুঝতে পেরেছি অনেক দিন পর।

ঘটনার পাঁচ বছর পর। ২০০৫ সাল। আমি তখন সালনায় গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিতে অধ্যয়নরত। ক্লাস শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে চড়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গাজীপুর ফিরছিলাম কিছু সহপাঠীর সঙ্গে।

বাসটিতে ছিল প্রচণ্ড ভিড়। সে ভিড়ের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারীর স্ত্রী ছোট বাচ্চা কোলে বাসে উঠলেন। বসার সিট না থাকায় এবং প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে বাচ্চাসহ ওই নারীটি ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছিলেন না। হঠাৎ আমার থাইল্যান্ডের সেই নির কথা মনে পড়ে গেল। খুব ইচ্ছা হচ্ছিল নিজে উঠে তাঁকে বসতে দিই। কিন্তু পরিচিত সহকর্মীরা কী বলবেন, কী ভাববেন, এটা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। আমাদের সঙ্গে কিছু পুরুষ সহকর্মী ছিলেন, যাঁরা যথেষ্ট ভালো ও মুক্ত মনের মানুষ। কিন্তু বিষয়টাকে কেন জানি তাঁরা তেমন গুরুত্ব দেননি। তাঁদের কথা ভেবেই আমার দ্বন্দ্বটা ছিল বেশি।

শেষ পর্যন্ত সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি সময় নিইনি। যেটুকু সময় নিয়েছি, তা ছিল আমার মানসিক সাহস ও দৃঢ়তার অভাবের জন্য।

বাচ্চাসহ কর্মচারীর স্ত্রীকে সিট ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সহকর্মীদের কেউ কেউ দাঁড়িয়ে গেলেন আমাকে বসতে দেওয়ার জন্য। যাঁদের একজনের সিট আমাকে নিতে হয়েছিল বাস্তবতা মেনে নিয়ে।

এরপর কেটে গেছে অনেকটা সময়। চলার পথে চেষ্টা করেছি বয়স্ক পুরুষ, নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষকে সিট ছেড়ে দিতে। মাঝেমধ্যে মুখোমুখি হতে হয় কিছুটা বিড়ম্বনার। আমাকে দাঁড়াতে দেখে অনেকেই তাকান। তাঁদের সেই তাকানোয় কী আছে, জানি না। তবে যা-ই থাকুক, অতীতের আমি আর বর্তমানের আমিতে যে তফাত, তা উপলব্ধি করতে পারি সহজেই। বর্তমানের আমি অনেকটাই সাহসী ও কিছুটা মানবিকও বটে।

ফারজানা নাসরীন খান, মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাবাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর