বন্ধু শব্দটি শুনলেই অন্য রকম অনুভূতি কাজ করে। মনে হয় খুব কাছের কেউ। যার সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া যায়। একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসে।

রাস্তার পাশে একটি বটগাছের গোড়ায় আসন পেতে জুতা সেলাই করছেন এক ব্যক্তি। তাঁর পাশে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে গল্প করছেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজা। কিছুদিন আগে এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। পরে পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়। জানা গেল, পেশায় চর্মকার ওই ব্যক্তির নাম রবি দাস, তিনি মাশরাফির বন্ধু।
একজনের নাম, যশ, প্রতিপত্তি সব হয়েছে; অন্যজন রয়ে গেছেন সমাজের সবচেয়ে নিচুতলায়। তবু তাঁদের সম্পর্কের নদীতে ভাটা পড়েনি। বন্ধুত্ব নামের নদীটি এমনই—সদা প্রবহমান।
এ জন্যই বুঝি কথায় বলে, বন্ধু আর বই সংখ্যায় কম হলেও ক্ষতি নেই, কিন্তু সঠিক বাছাই জরুরি। ভালুক দেখে দুই বন্ধুর মধ্যে একজনের গাছে চড়ে বসার গল্পটি ছোটবেলায় প্রায় সবাই পড়েছি, শুনেছি। বাছাইয়ের তাগিদ কেন, তা এ গল্পে পরিষ্কার।
কিন্তু শৈশবে স্বার্থ নামক অনুভূতি কিংবা জাগতিক হিসাব-নিকাশের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে না। তাই বন্ধুত্বের শুরুটা হয় শর্তহীনই। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেমন রং বদলায় সম্পর্কের, তেমনি বিস্তৃত হতে থাকে নিজেদের পরিসরও। কারও আত্মীয়তাসূত্রে স্বজনের সংখ্যা বাড়ে, কর্মক্ষেত্রে কারও-বা জুটে যায় নতুন বন্ধু। ফলে শৈশবের বন্ধু বা স্কুল-কলেজের ‘হরিহর আত্মা’ খ্যাতি পাওয়া সহপাঠীর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা অনেক সময় কমতে থাকে। একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধুও হয়ে যায় দূরের মানুষ।
হ্যাঁ, কিছু উপায় আছে বটে, সেগুলো মেনে চলতে পারলে যোগাযোগের ছেঁড়া সুতা আবার জোড়া দেওয়া যায়। এ জন্য প্রযুক্তির একটা ধন্যবাদ অবশ্যই প্রাপ্য। পৃথিবীর দুই প্রান্তে থাকা দুই বন্ধুর মধ্যে মুহূর্তে শুধু যোগাযোগ নয়, ‘মুখোমুখি বসিবার’ ব্যবস্থাও এখন পাকা। কিন্তু বন্ধুত্ব বাঁচিয়ে রাখার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর সেসব তরিকাই কি যথেষ্ট, আছে সে প্রশ্নও।
যুগ যুগ ধরেই মানুষ বন্ধুত্বকে উদ্যাপন করছে। কিন্তু এ জন্য দিবস পালনের চল ছিল না শতবছর আগেও। বন্ধুত্বের জয়গানের জন্যই বন্ধু দিবসের প্রচলন কি না, সেই ইতিহাসে ঢুঁ মেরে জানা গেল, দুই বা ততোধিক বন্ধুর মর্মস্পর্শী কোনো কাহিনি থেকে নয়, বরং দিবসটির সূচনা হয়েছিল মূলত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে।
গত শতকের ত্রিশের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের কার্ড ও উপহারসামগ্রী তৈরিকারক প্রতিষ্ঠান হলমার্কের প্রতিষ্ঠাতা জয়েস ক্লাইড হল ২ আগস্ট বন্ধু দিবস উদ্যাপনের বিষয়টি জনসমক্ষে আনেন। পরে র্যামন আর্তেমিও ব্রাচো নামের প্যারাগুয়ের এক চিকিৎসক ১৯৫৮ সালের ২০ জুলাই বিশ্বব্যাপী বন্ধু দিবস পালনের প্রস্তাব দিলে তা বেশ সাড়া ফেলে। ২০১১ সালে জাতিসংঘ ৩০ জুলাইকে বিশ্ব বন্ধু দিবসই ঘোষণা করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগস্টের প্রথম রোববার বন্ধু দিবস হিসেবে পালিত হয়।
বন্ধু দিবসের গোড়ার কথাটি হলো—‘বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে মানবিকতাকে ভাগাভাগি করে নেওয়া’। বলা হচ্ছে, বিভিন্ন দেশ, সমাজ ও মানুষের মধ্যে বন্ধুপ্রবণতা বাড়িয়ে আমরা শান্তি, ঐক্য ও স্থিতিশীলতাকে আরও সুসংহত করতে পারি।
র্যামন আর্তেমিও ব্রাচোও বিশ্বাস করতেন, সাংস্কৃতিক ভিন্নতা, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও ধর্মীয় বিভাজনকে পাশে ঠেলে মানুষে মানুষে মেলবন্ধন ঘটাতে পারে বন্ধুত্ব। এ কথায় দ্বিমত করার কিছু নেই বলে মনে করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা বিভাগের অধ্যাপক মো. আখতার হোসেন।
তিনি বলেন, বিশ্বের নানা প্রান্তে এই যে এত হানাহানি, সংঘাত চলছে, তা বন্ধ করতে পারে আমাদের বন্ধুভাবাপন্ন মানসিকতা। কাউকে শত্রু জ্ঞান করা নয়, বরং প্রতিপক্ষকে বন্ধুত্বের বার্তা দিতে হবে। এ জন্য বন্ধু দিবস একটা উপলক্ষ হতে পারে।
তবে বহুজাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি শেভরন বাংলাদেশের কর্মকর্তা মোমিনুল ইসলাম বললেন, বন্ধুত্ব পালনের কোনো দিন হয় না। বছরের ৩৬৫ দিনই বন্ধুর দিন।
মোমিনুল ইসলামের এ কথায় সহমত জানিয়ে ঢাকার ইউরোপীয় ইউইনিয়ন (ইইউ) ডেলিগেশনের কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বললেন, বন্ধুর সংজ্ঞা সবার কাছে হয়তো এক নয়, কিন্তু বন্ধুত্ব যে সব সম্পর্ক থেকে আলাদা, সেটা সবাই মানবেন। এ কারণে আলাদা এ সম্পর্ককে আলাদা করে মূল্যায়নের জন্য একটা দিনের দরকার আছে।
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, সংসার, ব্যস্ততা, কাজের চাপের মধ্যেও প্রিয়জন হারায় না। নিজের জীবন থেকে উদাহরণ টেনে তিনি বললেন, আড়াই যুগ আগে কলেজের পাট চুকিয়েছেন। এরপর কারণে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগে ভাটা পড়েছিল। কিন্তু এখন কলেজের বন্ধুরা আবার আগের মতো এক ছাতার তলে ভিড়েছেন। এ সময় পাশে বসা আখতার হোসেন ও মোমিনুল ইসলামের দিকে ইঙ্গিত করেন তিনি।
গত শুক্রবার রাজধানীর ধানমন্ডির এক রেস্তোরাঁয় কথা হচ্ছিল এই তিন বন্ধুর সঙ্গে। তাঁরা তিনজনই মানেন, যোগাযোগ ছিন্ন হওয়া মানে বন্ধুত্ব শেষ নয়। এক পা বাড়ালেই দেখবেন, বন্ধুটিও ছুটে এসে আপনাকে জড়িয়ে ধরবে। নিজে থেকেই ফোন করুন এবং বলুন ‘বন্ধু, কী খবর বল’। দেখবেন, সব ঠিক আগের মতো।