
‘আমার বাজানে আট মাস ধইরা লিবিয়ার জেলখানায় বন্দী। দালালের কাছে এই পর্যন্ত ৮ লাখ টাকা দিছি। কোনো কাম হয় নাই। আমার বাজানরে আম্মেরা (আপনারা) বাঁচান। ওর শরীরে ঘা-পাঁচড়া হয়ে গেছে। ওরে আমার বুকে ফিরাইয়া দ্যান।’
আদরের সন্তান মেহেদী হাসানকে ফিরে পেতে আজ রোববার দুপুরে মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনে অংশ নিয়ে এমন আকুতি জানিয়েছেন জেসমিন আক্তার (৬০)। তাঁর বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার পাতিলাদি এলাকায়।
শুধু জেসমিন আক্তারই নন, তাঁর ছেলের মতো লিবিয়ায় বন্দী ১২০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর পরিবারের সদস্য একই আকুতি জানিয়ে মানববন্ধনে অংশ নেন। ‘আটককৃতদের হতভাগ্য অভিভাবক ও স্বজন’ লেখা ব্যানারে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী তাঁরা মানববন্ধন করেন।
মানববন্ধনে স্বজনেরা বলেন, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলার ১২০ জন তরুণ লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রায় এক বছর ধরে লিবিয়ার একটি কারাগারে বন্দী। এর মধ্যে অনেকেই আবার দালালের হাতে জিম্মি। তাঁদের মুক্তিপণের জন্য লিবিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি দালালেরা প্রায়ই নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে লাখ লাখ টাকা দাবি করছেন। কেউ কেউ মুক্তিপণের টাকা পাঠালেও সন্তানদের মুক্তির কোনো সুরাহা করতে পারেননি।
লিবিয়ায় বন্দী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মুক্তি চেয়ে মাদারীপুর জেলা প্রশাসকসহ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও লিবিয়া দূতাবাসের কাছে অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে একটি স্মারকলিপি দেন তাঁরা।
বেলায়েত হোসেনের মা রিমা বেগম বলেন, ‘আমার পোলারে ফিরে পাইতে দালালরে সব মিলাইয়া ১৩ লাখ টাকা দিছি। আইজ ৮ মাস ধইরা আমার পোলা লিবিয়ার জেলে আটক আছে। কোনহানে আছে তা–ও ঠিকমতো জানি না। সারা দিনে পাঁচ টাকার একটা রুটি আর আধা কেজি পানি খাইতে দেয়। এভাবে থাকলে আমার পোলাডা লিবিয়ার জেলে মইরা যাব।’
ভাইয়ের জন্য সর্বস্ব হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন শরীয়তপুরের নড়িয়া থানার আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘লিবিয়াতে গিয়ে সেখানকার সন্ত্রাসীদের হাতে আটকা পড়ে আমার ভাই। পরে তাদের লিবিয়ার জেলে ঢুকিয়ে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। মুক্তিপণের টাকা না দেওয়ায় আমার ভাইরে এখনো ছাড়ে নাই। মুক্তিপণের টাকার জন্য মাঝেমধ্যেই নির্যাতন চালানো হইতেছে।’
মানববন্ধনে সদর উপজেলার রাস্তি ইউনিয়নের বাসিন্দা বিষ্ণু মন্ডল বলেন, ‘আমরা ভুল করেছি। লোভে পড়ে এভাবে আমাদের কাছের মানুষদের বিদেশে পাঠানো ঠিক হয়নি। শেষ সময় এসে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের একটাই দাবি, যেভাবেই হোক তিনি যেন আমার ভাইকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন।’
এ বিষয়ে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন বলেন, লিবিয়ায় বন্দী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও লিবিয়া দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। আশা করছেন, খুব শিগগির তাঁদের অন্য কোনো সমস্যা না থাকলে সরকারি ব্যবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।