বিজয়ের মাস: মুক্ত জগন্নাথদীঘি

ওড়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা

ঘড়ির কাঁটায় তখন আনুমানিক সকাল ১০টা। চারদিক থেকে শত শত মুক্তিযোদ্ধা এসেছিলেন ইপিআর ক্যাম্পে। কেউ কাঁদছেন, কেউ আনন্দে উল্লাস করেছিলেন। সবার মধ্যে ছিল অন্য রকম আনন্দ। ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত মুক্তিযোদ্ধারা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করছেন। এরই মধ্যে ওই ক্যাম্পে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়। তুমুল করতালি আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা গোটা এলাকা প্রকম্পিত করে তোলেন। সবার মধ্যে মুক্তির আনন্দ। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগন্নাথদীঘির এ দৃশ্য ১৯৭১ সালের ২৮ নভেম্বরের। 
১৯৭১ সালের ২৮ নভেম্বর স্বাধীনতাযুদ্ধে কুমিল্লার রণাঙ্গনে প্রথম মুক্তাঞ্চল ঘোষিত হয় ওই এলাকা। এই দিন পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাপ্টেন জং এবং তাঁর বাহিনীর সদস্যদের পতন ঘটে। সকাল ১০টায় জগন্নাথদীঘি তৎকালীন ইপিআর (বর্তমানে বিজিবি) ক্যাম্পে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন মুক্তাঞ্চল ঘোষণার বিস্তারিত প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেন, ‘১৯৭১ সালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জগন্নাথদীঘি অঞ্চল ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেওয়ার পরপরই আমরা ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিকামী তরুণদের সংগঠিত করি। একই সঙ্গে ভারতের ইয়ুথ ক্যাম্প থেকেও প্রশিক্ষণ নিয়ে তরুণেরা আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন। ৭৫ জনের দলটি তিনটি ভাগে ভাগ হয়ে কাজ করি। এ ক্ষেত্রে আমরা চৌদ্দগ্রামের পাশাপাশি কুমিল্লা ও ফেনীর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করি। ১৯৭১ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান দিবস উপলক্ষে চৌদ্দগ্রামের চান্দিশকরা গ্রামে পাঁচজন পাকিস্তানি সেনাসহ একটি জিপগাড়ি উড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে তিনজন নিহত ও দুজন আহত হন। জগন্নাথদীঘি-সংলগ্ন ডিমাতলী এলাকার একটি উঁচু ঢিবির ওপর আমাদের গোপন ক্যাম্প ছিল। ১১ নভেম্বর ভোরে জগন্নাথদীঘি ইউনিয়নের দক্ষিণ বেতিয়ারা এলাকায় ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের নয়জন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা হানাদার বাহিনীর হামলায় শহীদ হন। ওই ঘটনার পর ডিমাতলী ক্যাম্পের উদ্যোগে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা একসঙ্গে বসি। ২৭ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে ২৮ নভেম্বর ভোর পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাপ্টেন জং এবং তাঁর বাহিনীর ওপর দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটতে শুরু করে। ২৮ নভেম্বর ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ক্যাপ্টেন জং তাঁর জীবিত ও মৃত সেনাদের নিয়ে ফেনীর দিকে পালিয়ে যায়।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষক আবুল কাশেম হৃদয়ের লেখা মুক্তিসংগ্রামে কুমিল্লা বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর রাতে জগন্নাথদীঘি পাকবাহিনীর ক্যাম্পে বিভিন্ন দিক থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়। মুক্তিবাহিনীর গোলাবর্ষণে টিকতে না পেরে ক্যাপ্টেন জং তাঁর বাহিনী নিয়ে পালিয়ে যায়। জগন্নাথদীঘি ইপিআর ক্যাম্পে জসিম উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আনুষ্ঠানিক পতাকা উত্তোলন করেন। এ পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে এ এলাকা আনুষ্ঠানিক মুক্তাঞ্চল বলে গণ্য হয়। বৃহত্তর কুমিল্লায় আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠার ঘটনা এটাই প্রথম।’