খুন হওয়ার আগে কিশোর সনি তরবারি হাতে টিকটক ভিডিও দেয়

কিশোর সনি হত্যায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই তরুণ
ছবি: প্রথম আলো

রাজশাহীতে খুন হওয়া এসএসসি পরীক্ষার্থী মো. সনির (১৭) একটি তরবারি হাতে টিকটক ভিডিও সবার নজরে এসেছে। ভিডিওটি সে খুন হওয়ার ২০ দিন আগে প্রকাশ করেছিল, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও ছড়িয়েছে।

ভিডিও থেকে তাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় ‘কিশোর গ্যাং’–এর দ্বন্দ্ব বিষয়টি সামনে এসেছে। পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডের পর রাজশাহী নগরে উঠতি বয়সীদের নিয়ন্ত্রণে তৎপরতা শুরু করেছে বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছে।

টিকটকের জন্য ধারণ করা ভিডিওটি গত ১৪ জুন সনি তার ফেসবুক আইডিতে প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, তরবারি নিয়ে সে হেঁটে যাচ্ছে। তার পেছনে সমবয়সী আরেক কিশোর। পুলিশ বলছে, এ ভিডিওকে সনির প্রতিপক্ষ মঈন গ্রুপ নিজেদের জন্য হুমকি মনে করে।

গত রোববার একদল উঠতি বয়সী তরুণ–কিশোর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের সামনে থেকে দুই কিশোরকে তুলে নিয়ে কুপিয়ে জখম করে। এর মধ্যে এসএসসি পরীক্ষার্থী সনির মৃত্যু হয়। পরদিন সোমবার স্বজনেরা তার লাশ নিয়ে এলাকায় বিক্ষোভ করেন। তাঁরা সনি হত্যা মামলার আট আসামির ছবি দিয়ে একটি ব্যানার তৈরি করেন। এর মধ্যে ছয়জনই কিশোর। ব্যানারে বড় করে লেখা হয়েছে ‘কিশোর গ্যাং।’ ব্যানারটি এখনো রাজশাহী নগরের রেলগেট এলাকায় ঝোলানো রয়েছে।

আসামিদের মধ্যে তিনজন গ্রেপ্তার হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল বুধবার দিবাগত রাতে র‌্যাব দুজনকে গ্রেপ্তার করে। র‌্যাব বলছে, মামলার প্রধান আসামি পলাতক মঈন ওরফে আন্নাফ (২০) মঈন গ্রুপের প্রধান। এই গ্রুপের সঙ্গে সনির গ্রুপের বিরোধের জেরে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মঈন গ্রুপ রাজশাহী মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ অবৈধভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালায়। এ বিরোধের জেরে মঈন গ্রুপ সনিকে টার্গেট করে শহরের বিভিন্ন জায়গায় তার ওপর হামলার পরিকল্পনা করেছিল।

পুলিশ বলছে, সনি ও মঈন গ্রুপের মধ্যে বিরোধ পুরোনো। সনি গ্রুপ গত ঈদুল ফিতরের সময় শহরের আরডিএ মার্কেটের ভেতর মঈন গ্রুপের ওপর হামলা করে। একজনকে কুপিয়ে জখম করে। তার শরীরে ১৮টি সেলাই পড়ে। এ ঘটনায় সনির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। এর আগে অন্য আরেকটি গ্রুপের সঙ্গে মারামারির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়েছিল। এ দুটি মামলার পর কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে ছিল সনি। সম্প্রতি মঈন গ্রুপের সঙ্গে মীমাংসা হয়। সে প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে শুরু করে।

এর মধ্যে গত ১৪ জুন সনির তরবারি হাতে ওই টিকটক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, মঈন গ্রুপ নিজেদের জন্য হুমকি মনে করে। এর ২০ দিনের মাথায় সনি খুন হয়।

এখন পুলিশ কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে জোর তৎপরতা শুরু করেছে। আজ বৃহস্পতিবার রাজশাহী মহানগর পুলিশের আইনশৃঙ্খলা সভায় উঠতি বয়সীদের নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়া হয়েছে। সভায় উঠতি বয়সীদের নিয়ন্ত্রণে ইতিমধ্যে গৃহীত কিছু পদক্ষেপ বিষয়ে আলোচনা হয়। বখাটে কিশোরদের ডেটাবেজ করা হচ্ছে।

আজ আইনশৃঙ্খলা সভায় বলা হয়েছে, ঈদের মধ্যে বাইরে থেকে অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িত কিশোরেরা রাজশাহীতে আসবে। তারা মাদক সেবন করবে, আইনশৃঙ্খলার অবনতির চেষ্টা করবে। তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তালিকাভুক্ত কিশোরদের নজরদারিতে রাখতে হবে।

রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, তিনি রাজশাহীতে যোগ দেওয়ার পর থেকে উঠতি বয়সী ছেলেদের একটা ডেটাবেজ তৈরি করেছেন। এতে ৫০০ কিশোরের নাম রয়েছে। প্রতিদিনই তাদের বিভিন্ন থানায় নিয়ে এসে ‘মোটিভেশন’ দেওয়া হচ্ছে।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নগরের বোয়ালিয়া থানা–পুলিশ ৫৪ জন উঠতি বয়সী কিশোর-তরুণকে ধরে নিয়ে ‘মোটিভেশন’ দিয়েছে। এ সময় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম তাদের উদ্দেশে বলেন, এখন থেকে টিকটক বন্ধ। কেউ টিকটক করবে না। এখানে-ওখানে দলবেঁধে বসে থাকা যাবে না। ইভটিজিং করা যাবে না। কিশোরেরা ওসির কথায় সম্মতি দেয়। ওসি বলেন, এখন অভিভাবকেরা মুচলেকা দিয়ে সবাইকে নিয়ে যাবেন। চুল কাটানো হয়েছে কি না, তা পরদিন থানায় এসে দেখিয়ে যেতে হবে। কিশোরেরা চুল কেটে ওসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যাচ্ছে।