জেলেদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই জালে কম পরিশ্রমে বেশি মাছ ধরা যায়। মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কারেন্ট জালের চেয়েও ভয়ংকর।

‘চায়না দুয়ারি’ নামে ভয়ংকর এক জাল ছড়িয়ে পড়েছে বরিশালসহ দক্ষিণের নদ-নদী, বিল-বাঁওড়ে। হালকা ও মিহি বুননের ছোট ফাঁসের এই জালে আটকা পড়ে বেঘোরে মারা পড়ছে নানা প্রজাতির মাছ, পোনা। কম পরিশ্রমে বেশি মাছ ধরতে পারায় কারেন্ট জালের চেয়েও বিপজ্জনক এই জাল দক্ষিণের জেলেদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
গোল লম্বাকৃতির এই জাল স্রোতের মুখে ফেলে রাখলে জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা ছোট–বড় মাছ একবার ভেতরে ঢুকলে আর বেরোতে পারে না। ফলে এই জালে অসংখ্য মাছ, মাছের পোনাসহ সব ধরনের জলজ প্রাণী-উদ্ভিদ, খাদ্যকণা (প্লাঙ্কটন) ধ্বংস হচ্ছে। এতে মাছের বংশবিস্তার মারাত্মক হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা।
চায়না দুয়ারিকে জাল হিসেবে বর্ণনা করা হলেও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটা চাঁই বা কারেন্ট জালের চেয়েও ভয়ংকর এক ফাঁদ। এই জাল এমনভাবে বোনা হয়েছে যে একটি গিঁট থেকে আরেকটি গিঁটের দূরত্ব খুব কম। মূলত মশারি তৈরির নেটের আদলে এই জাল বোনা। এ জন্য এতে মাছ একবার ঢুকলে আর বের হতে পারে না। জালটি দক্ষিণাঞ্চলে ‘চায়না জাল’, ‘ম্যাজিক জাল’ নামেও পরিচিত।
মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, দেশে মাছ ধরার জালের ফাঁসের অনুমোদিত পরিমাপ রয়েছে; সাড়ে ৫ সেন্টিমিটার (সংশোধিত আইন)। জালের ‘ফাঁস’–এর চেয়ে কম হলে তা আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ। দেশে নিষিদ্ধ জালের তালিকায় চায়না দুয়ারির নাম উল্লেখ না থাকলেও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী এটি নিষিদ্ধ।
জেলেরা বলছেন, চায়না দুয়ারি নামে পরিচিত এই জাল দেশেই উৎপাদিত হয়। তবে জালের সুতা সূক্ষ্ম আর মিহি বলে অনেকের ধারণা, এই জালের সুতা চীন থেকে আমদানি করা হয়। তাই জালটির নামের সঙ্গে ‘চায়না’ শব্দটি যুক্ত হয়ে গেছে। বিশেষ এই জালের দুই মাথা খোলা বলে একে ‘দুয়ারি’ বলা হয়।
নিষেধাজ্ঞার গেজেটে চায়না দুয়ারির নাম থাকুক বা না থাকুক, মৎস্য আইনে এই জাল নিষিদ্ধ। এরই মধ্যে বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় এই জালের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছি আমরা। বরিশালের গৌরনদী, আগৈলঝাড়া থেকে বিপুলসংখ্যক জাল জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে। বিশেষ করে অগভীর বিল এলাকায় বেশি সংখ্যায় ব্যবহৃত হচ্ছে এই জালমৎস্য অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগের উপপরিচালক আনিসুর রহমান তালুকদার
মান এবং দৈর্ঘ্যভেদে চায়না দুয়ারির আকার নির্ধারিত হয়। সাধারণত ৫০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত দীর্ঘ এই জাল। প্রস্থে এক থেকে দেড় ফুট আর এর গিঁট বা ফাঁস এতই ক্ষুদ্র যে পানি ছাড়া আর কোনো কিছু বের হতে পারে না।
জালের মধ্যে দেওয়ার জন্য লোহার চারকোনা রড দিয়ে অনেকগুলো ফ্রেম বসিয়ে এই জাল তৈরি করা হয়। এটি নদীর একেবারে তলদেশ পর্যন্ত যায় এবং তলদেশের মাটির সঙ্গে মিশে থাকে। ফলে কোনো মাছ একবার জালে ঢুকলে আর বের হতে পারে না।
বরগুনার তালতলী উপজেলার বগি এলাকার এক জেলে জানান, দৈর্ঘ্য ও মানভেদে একটি চায়না দুয়ারির দাম স্থানীয় বাজারে ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়।
জেলেরা বলছেন, বছর দেড়েক ধরে বরিশালসহ দক্ষিণ উপকূলের জেলেরা এই জাল ব্যবহার শুরু করলেও এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে আনাচকানাচে। এক রাতে এই জালে যে পরিমাণ মাছ ওঠে, তা অন্য কোনো জালে উঠে না, সেই তুলনায় পরিশ্রমও তেমন করতে হয় না। কম পরিশ্রমে বেশি মাছ, বেশি আয় হয় বলেই এই জাল দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে এ অঞ্চলে।
বরগুনার তালতলী উপজেলার জয়ালভাঙা, বগি বাজারসংলগ্ন স্লুইসগেট, পাথরঘাটার চরদুয়ানি, বরগুনা সদরের বাঁশবুনিয়া এবং বামনার বুকাবুনিয়া এলাকাতেও এই জালের ছড়াছড়ি।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ, একোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, চায়না দুয়ারি দেশের মৎস্যসম্পদের জন্য এক নতুন হুমকি। এই জালের ব্যাপক বিস্তারের ফলে দেশে মাছের বংশবিস্তার বিঘ্নিত হওয়া ছাড়াও অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘উপকূলে নেট জালের মাধ্যমে বাগদা চিংড়ির রেণু পোনা শিকার হতো। তখনো এ রকম সংকটে পড়েছিলাম আমরা। অবশ্য এখন সেটা অনেকটাই বন্ধ হয়েছে। কিন্তু নতুন করে এই চায়না দুয়ারি জাল এসে আবারও সেই আতঙ্কজনক পরিস্থিতি ফিরিয়ে এনেছে। ছোট ছোট প্রজাতির মাছ এবং মাছের রেণু পোনা মূলত নদী তীরের অগভীর পানিতেই থাকে। সেই জায়গায় এ রকম ভয়ানক জাল পাতা মানে পুরো মৎস্যসম্পদকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।’
এই জালের বিস্তারে উদ্বেগ প্রকাশ করে মৎস্য অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগের উপপরিচালক আনিসুর রহমান তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার গেজেটে চায়না দুয়ারির নাম থাকুক বা না থাকুক, মৎস্য আইনে এই জাল নিষিদ্ধ। এরই মধ্যে বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় এই জালের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছি আমরা। বরিশালের গৌরনদী, আগৈলঝাড়া থেকে বিপুলসংখ্যক জাল জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে। বিশেষ করে অগভীর বিল এলাকায় বেশি সংখ্যায় ব্যবহৃত হচ্ছে এই জাল।’