দৌলতদিয়ায় ফেরির জন্য অপেক্ষমাণ মানুষদেরও ছুঁয়ে গেল পদ্মা সেতু চালুর আনন্দ

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে শত শত যানবাহন ফেরির জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। এতে করেছে দুর্ভোগে পড়েছেন এসব যানবাহনের যাত্রী ও শ্রমিকেরা। তবে তাঁদেরও ছুঁয়ে গেছে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আনন্দ
ছবি: প্রথম আলো

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ঘাট এলাকায় পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আগত দর্শনার্থীরা যখন আনন্দে মত্ত, সেই সময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটে শত শত যানবাহন আটকে আছে ফেরি পারের অপেক্ষায়। এমন দুর্ভোগের মধ্যেও পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আনন্দ ছুঁয়ে যায় এসব যানবাহনের যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকদের।

আজ শনিবার সকালে যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাওয়া প্রান্তে বহুল কাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতু উদ্বোধন করছেন, ঠিক সেই সময় দৌলতদিয়া ঘাটে অবস্থান করছিলেন ব্যবসায়ী মো. ফরিদ উদ্দিন। বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার গ্রামের বাড়ি থেকে পরিবারের সবাই মিলে ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় যাচ্ছিলেন। আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দৌলতদিয়া ৫ নম্বর ফেরিঘাট সড়কে বরিশাল থেকে আসা একটি বাসে বসে ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিলেন তাঁরা।

রবি বা সোমবার পদ্মা সেতু দিয়ে গ্রামের বাড়ি যাবেন জানিয়ে ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘গত বুধবার গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। আমাদের এক আত্মীয় মারা যাওয়ায় ঢাকায় যাচ্ছি। সেখান থেকে নারায়ণগঞ্জে যাব। এই ঘাট দিয়ে নদী পাড়ি দেওয়া হয়তো এটাই শেষ। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া দৌলতদিয়া ঘাট দিয়ে আসা হবে না।’

ফরিদ উদ্দিন আরও বলেন, ব্যবসার সুবাদে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় থাকতে হয়। গ্রামের বাড়ি বরিশালে হওয়ায় বাসে গেলে ফেরিঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হতো। একদিকে যেমন অনেক সময় লাগত, অন্যদিকে টাকাও খরচ হতো অনেক। এখন সেই সমস্যা মিটল।

স্বামীর কথার শেষে বাসের পেছনের আসনে বসা স্ত্রী খাদিজা বেগম বলেন, ‘এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু উদ্বোধন করছেন আর আমরা দৌলতদিয়ায় ফেরির জন্য ঘাটে বসে আছি। তবে এখানে জ্যামে বসে থাকলেও আমাদের জন্য অনেক আনন্দের সংবাদ এটা। এখন আর আমাদের বাড়ি যেতে ঘাটে অপেক্ষা করতে হবে না। শেষবারের মতো দৌলতদিয়া ঘাট দিয়ে নদী পাড়ি দিচ্ছি বলে এই ভ্রমণও অনেক দিন মনে থাকবে।’

আজ দুপুরে দৌলতদিয়া ঘাটে দেখা যায়, ফেরিঘাট থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোয়ালন্দের ওয়াজেদ চৌধুরী টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ঢাকামুখী যানবাহনের সারি রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পণ্যবাহী গাড়ি। ফেরিঘাট এলাকার প্রায় এক কিলোমিটার সড়কে পণ্যবাহী গাড়ির সঙ্গে যাত্রীবাহী বাসও রয়েছে।

ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত যাত্রীরা বাইরে নেমে স্বস্তি পেতে চাইছেন। শনিবার দুপুরে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে

লম্বা লাইনে থাকা পণ্যবাহী একটি ট্রাকের চালক মো. হানিফ শেখ বলেন, আজ পদ্মা সেতু উদ্বোধন হচ্ছে, এটা অনেক খুশির খবর।

নারায়ণগঞ্জ যেতে প্রায় ১০০ কিলোমিটার বেশি পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে জানিয়ে হানিফ শেখ বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর পটুয়াখালী থেকে ট্রাক নিয়ে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দিই। রাত ১০টার দিকে গোয়ালন্দ মোড় এসে আটকা পড়ি। দুই দিন থাকার পর আজ সকালে আমাদের ঘাটের দিকে ছেড়েছে। যে পরিমাণ গাড়ি রয়েছে, মনে হয়, ফেরিতে উঠতে রাত হয়ে যাবে।’

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাটে কর্তব্যরত সহকারী ব্যবস্থাপক মো. খোরশেদ আলম বলেন, বর্তমানে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ছোট-বড় মিলিয়ে ২০টি ফেরি চলছে। নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় ফেরি পার হতে আগের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি সময় লাগছে। তবে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে অনেক যাত্রীবাহী পরিবহন আসেনি। কী পরিমাণ পরিবহন পারাপার হবে, তা আগামীকাল-পরশু থেকে বোঝা যাবে।

এদিকে পণ্যবাহী গাড়ির চাপ থাকায় কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশের সহায়তায় দালাল চক্র মাছের গাড়িসহ কাঁচা পণ্যের গাড়ি আগে ফেরিতে তুলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আজ বেলা ১১টার দিকে দৌলতদিয়ার ৫ নম্বর ফেরিঘাট সড়কে ফেরির জন্য একটি ছোট ট্রাক অপেক্ষায় ছিল। এ সময় এক ট্রাফিক সার্জেন্ট ট্রাকটির কাছে এসে চালকের সঙ্গে কথা বলেন। এরপরই গাড়িটি ঘুরিয়ে সামনের ৬ নম্বর ঘাটের দিকে যেতে বলেন। এই প্রতিবেদকসহ আরও কয়েকজন সংবাদকর্মী এ দৃশ্য দেখেন।

খায়রুল আলম নামের ওই ট্রাফিক সার্জেন্টের কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ‘গাড়িটি কেন সামনে এসেছে, এর কারণ জানতে চেয়ে ঘুরে যেতে বলা হয়। এ ছাড়া গাড়ি আগে ফেরিতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের সহযোগিতা করার সুযোগ নেই।’

জানতে চাইলে রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার এম এম শাকিলুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ঘাটে যানজট থাকলে যেকোনো জরুরি পণ্যের গাড়ি ফেরিতে আগে ওঠার বিষয়ে পুলিশ সদস্যরা সহযোগিতা করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে অনিয়ম করার সুযোগ নেই। যদি এ ধরনের কোনো প্রমাণ মেলে, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।