নেতাদের ‘অন্য খেলায়’ দৌলতপুরে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি

কুষ্টিয়া জেলার মানচিত্র
কুষ্টিয়া জেলার মানচিত্র

তৃতীয় ধাপে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মধ্যে মাত্র ৪টিতে জয় পেয়েছেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থী। বাকি ১০টির মধ্যে ৯টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ও একটিতে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী জয় পেয়েছেন। এমনকি সাংসদের নিজ এলাকাতেও জয় পাননি নৌকার প্রার্থী।

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সাংসদ ও দৌলতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ ক ম সারোয়ার জাহান এবং সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দীনের বাড়ি যে ইউনিয়নে, সেই ফিলিপনগর ইউপিতে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী নঈমুদ্দীন। ভোটের ব্যবধানও অনেক। বিদ্রোহী প্রার্থী পেয়েছেন ৭ হাজার ১৪০ ভোট। সেখানে নৌকার প্রার্থী পেয়েছেন ৪ হাজার ৫৯৩ ভোট। ভোটের ব্যবধান ২ হাজার ৫৪৭। এমন পরাজয়ে সাংসদসহ দলীয় নেতাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মীদের অভিযোগ, নির্বাচনে দলীয় নেতারা মঞ্চে একরকম বক্তব্য রাখলেও ভেতরে-ভেতরে তাঁরা অন্য খেলা খেলেছেন। যার কারণে দলীয় প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। বেশির ভাগ আওয়ামী লীগ নেতা যাঁর যাঁর ইউনিয়নে নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, যার কারণে ১৪টি ইউপির মধ্যে মাত্র ৪টি জয়ী হয়েছেন দলীয় প্রার্থী। বাকি ইউপিতে দলের বিদ্রোহীরা জিতেছেন। এমনকি বিএনপির একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও জয়ী হয়েছেন দলীয় কোন্দলের কারণে।

১৪টি ইউপির মধ্যে ৯টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ও একটিতে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী জয় পেয়েছেন। এমনকি সাংসদের নিজ এলাকাতেও জয় পাননি নৌকার প্রার্থী।

তৃতীয় ধাপে গতকাল রোববার দৌলতপুর উপজেলার ১৪টি ইউপি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বেশির ভাগ এলাকায় ধরাশায়ী হয়েছে নৌকা। সাধারণ মানুষ ও দলীয় কর্মীরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে এই উপজেলায় আওয়ামী লীগ থেকে বর্তমান চেয়ারম্যানদেরই নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। একাধিকবার চেয়ারম্যান থাকায় অনেকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিল। তাঁদেরই আবার নতুন করে মনোনয়ন দেওয়া হয়। আবার দল ও এলাকায় জনপ্রিয় এমন অনেকে মনোনয়ন চেয়ে পাননি। তাঁরাও ক্ষুব্ধ হন। প্রায় সব নেতাই ভেতরে-ভেতরে বিদ্রোহীদের সমর্থন জুগিয়েছেন। এমনকি কিছু নেতার হুমকি-ধমকিতে সাধারণ কর্মী ও ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নেন, যার খেসারত দিতে হয়েছে।

নির্বাচনী প্রচারণার শুরুর দিন থেকেই দলীয় শীর্ষ নেতারা তাঁদের প্রার্থীদের পথসভায় অংশ নেন। এসব পথসভায় নৌকায় ওপেন সিল মারার হুমকি দেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এসব হুমকিতে সাধারণ ভোটাররা বিমুখ হয়েছেন বলে দলটির সাধারণ কর্মীরা মনে করছেন।

আড়িয়া ইউপিতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী সাঈদ আনছারীর পথসভায় উপজেলা আওয়ামী লীগের দুই নেতা প্রকাশ্যে সিল মারার হুমকি দিয়েছিলেন। সেই ইউপিতে নৌকার প্রার্থী ভোট পেয়েছেন ৬ হাজার ৮৫ ভোট। আর বিদ্রোহী প্রার্থী পেয়েছেন ১০ হাজার ৭০৭ ভোট।

বোয়ালিয়া ইউপিতে নৌকার প্রার্থী পেয়েছেন ৩ হাজার ২১৫ ভোট। সেখানে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী পেয়েছেন ৬ হাজার ৭৬৮ ভোট। আদাবাড়িয়া ইউপিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী পেয়েছেন ১০ হাজার ৪২২ ভোট। সেখানে নৌকার প্রার্থী পেয়েছেন ৫ হাজার ৭৪৯ ভোট। পিয়ারপুর ইউপিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী পেয়েছেন ৯ হাজার ৫১৮ ভোট। সেখানে নৌকার প্রার্থী পেয়েছেন ২ হাজার ৩৩৭ ভোট।

জয়ী এক বিদ্রোহী প্রার্থী বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলের কর্মীদের কাছে কেউ আসেনি। মাঠের খবর কেউ নেয়নি। তার ফলে জনগণ ও কর্মীরা তাঁদের সিদ্ধান্ত ভোটের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন।

জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সমন্বয়ের অভাবেই এমনটি ঘটেছে। নৌকার জনপ্রিয়তা কমেছে, এটা আমি বিশ্বাস করি না। দৌলতপুর সব সময় আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। সেখানে যাঁরা জয় পেয়েছেন, তাঁরা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ছিলেন। আর নৌকার প্রার্থীর কেন এমন পরাজয় হলো, সেটা খতিয়ে দেখা হবে। তিনি আরও বলেন, ‘একজন সাংসদ ও দলের শীর্ষ নেতাদের বাড়ি যে এলাকায়, সেখানেও নৌকা হেরেছে। এটাও দলীয় ফোরামে তোলা হবে। যাঁরা দলটার ক্ষতি করছেন, তাঁদের বিষয়ে আলোচনা হবে।’