ধর্ষণচেষ্টার শাস্তি কান ধরে ১০ বার ওঠবস

ধর্ষণচেষ্টা
প্রতীকী ছবি

বাক্‌প্রতিবন্ধী এক তরুণীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন এক ব্যক্তি। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ওই তরুণীর পরিবার ও অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষের লোকজনকে নিয়ে সালিস বৈঠক করে গ্রামের মাতবরেরা। সালিসে মাতবরদের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি হিসেবে কান ধরে ওঠবস ও ভর্ৎসনা করে ছেড়ে দেওয়া হয়। অথচ প্রচলিত আইনে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় সর্বনিম্ন পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা করার কথা। ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার পাড়ইল ইউনিয়নে।

বাক্‌প্রতিবন্ধী ওই নারীর পরিবার ও কয়েক প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাড়ির প্রাচীর টপকে বাক্‌প্রতিবন্ধী ওই তরুণীর (২৫) ঘরে ঢুকে তাঁর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন খোকন মিয়া (৩৫) নামের এক ব্যক্তি। ঘটনাটি টের পেয়ে স্বজন ও প্রতিবেশীরা ছুটে এসে খোকনকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন এবং সারা রাত তাঁকে আটকে রাখেন। এরপর ওই তরুণীর পরিবার গ্রামের মাতবরদের বিষয়টি জানান।

স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতিবন্ধী তরুণীর পরিবার দরিদ্র হওয়ায় তাঁদের আইনের আশ্রয় নিতে নিরুৎসাহিত করেন মাতবরেরা। গ্রামের সালিসের মাধ্যমে এ ঘটনার বিচারের পরামর্শ দেন তাঁরা। পরদিন সকালে প্রতিবন্ধী তরুণীর বাড়ির সামনে সালিস বৈঠক বসে। সালিসে স্থানীয় ইউপি সদস্য ইউসুফ আলী, স্থানীয় একটি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক, একটি মসজিদের ইমাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। দুই পক্ষের কাছ থেকে ঘটনা শোনার পর প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণচেষ্টার অপরাধে গ্রামের মাতবরেরা খোকন মিয়াকে ১০ বার কান ধরে ওঠবস করার শাস্তি দেন। এ ছাড়া সালিসে অভিযুক্ত খোকন এ ধরনের কাজ আর কখনো করবেন না বলে মুচলেকা দেন।

ওই তরুণীর বাবা বলেন, ‘আমার মেয়ের সম্মানহানি করতে খোকন মিয়া তাঁর ঘরে ঢুকেছিল। তাঁকে আমরা হাতেনাতে ধরে ফেলি। বিষয়টি রাতেই আমি মেম্বারসহ (ইউপি সদস্য) গ্রামের অন্য মাতবরদের জানাই। মামলা করলে অনেক টাকাপয়সা খরচ হবে বলে তাঁরা আমাকে থানায় মামলা না করার জন্য পরামর্শ দেন। সালিসেই খোকনের কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে বলে তাঁরা আশ্বাস দেন। কিন্তু সালিসে খোকন মিয়াকে শুধু কান ধরে ওঠবস করার শাস্তি দেওয়া হয়। এটা কোনো শাস্তিই হলো না। তারপরও সালিসের বিচার না মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নাই। কারণ, আমরা গরিব মানুষ। এটা নিয়ে আবার থানা-কোর্ট করতে গেলে গ্রামের মাতবরেরা আমাদের গ্রামেই থাকতে দেবে না।’

ওই প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য আজ শুক্রবার সকালে অভিযুক্ত খোকন মিয়ার বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় কান ধরে ওঠবস করার শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে সালিস বৈঠকের অন্যতম মাতবর স্থানীয় ইউপি সদস্য ইউসুফ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সালিসে আমি উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু আমি কোনো সিদ্ধান্ত দিই নাই। গ্রামের মুরব্বিরা এ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। সালিসে অভিযুক্ত খোকন মিয়া তাঁর ভুল স্বীকার করেন এবং এমন ঘটনা কখনোই করবেন না মর্মে মুচলেকা দেন। এ জন্য মাতবরেরা তাঁকে কিছুটা লঘু শাস্তি ১০ বার কান ধরে ওঠবস করার রায় দেন।’

তবে ধর্ষণচেষ্টার শাস্তি সালিস বৈঠক ডেকে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন নওগাঁ জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মহসিন রেজা।

তবে ধর্ষণচেষ্টার শাস্তি সালিস বৈঠক ডেকে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন নওগাঁ জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মহসিন রেজা। এ বিষয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনো নারী কিংবা শিশুকে ধর্ষণ অথবা ধর্ষণচেষ্টা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এ ধরনের ঘটনার সুস্পষ্ট ধারা রয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় সালিস ডেকে বিচার করার কোনো সুযোগ নেই। ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা একমাত্র নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আমলে নিয়ে বিচার করতে পারবেন। অন্য কোনোভাবে বিচারের সুযোগ নেই। যাঁরা সালিস ডেকে শ্লীলতাহানির ঘটনার বিচার করেছেন, তাঁরা অন্যায় করেছেন।’

আইনজীবী মহসিন রেজা আরও বলেন, ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় শাস্তি হিসেবে আদালত দোষী সাব্যস্ত হওয়া ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের ও সর্বনিম্ন ৫ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা করতে পারেন।’

এ বিষয়ে নিয়ামতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। খোঁজখবর নিয়ে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।