ভাষাসৈনিকের আক্ষেপ

বছরে শুধু একটা দিনই আমাদের স্মরণ করা হয়

রাজশাহীর ভাষাসৈনিক মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জি।
ছবি: প্রথম আলো

ভাষাসৈনিকেরা কোথায় কী অবস্থায় আছেন, তাঁদের হালহকিকত কী, শরীরের কী অবস্থা, চিকিৎসা করার সামর্থ্য আছে কি নেই—এসব বিষয়ে কেউ খোঁজ নেন না। বছরে শুধু একটা দিনই তাঁদের স্মরণ করা হয়।

আলাপের শুরুতেই রাজশাহীর ভাষাসৈনিক মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জি এভাবে আক্ষেপ করলেন। রাজশাহীতে যাঁরা ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে শুধু তিনিই এ শহরে আছেন। বয়স এখন ৮৬ চলছে। এই ভাষাসৈনিকের সঙ্গে গতকাল শনিবার সকালে কথা হয় রাজশাহী নগরের আরডিএ মার্কেটে অবস্থিত তাঁদের প্রায় দেড় শ বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান এক নম্বর গদিতে বসে।

মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জির আরেক আক্ষেপ, ‘এত দিনেও আমরা বাংলাকে জ্ঞান–বিজ্ঞানের সব ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার উপযোগী একটা ভাষায় রূপ দিতে পারি নাই।’

কথা বলতে বলতেই তাঁর কাছে ফোন আসে রাজশাহী মহিলা কলেজ থেকে, একুশে ফেব্রুয়ারির দিন সকাল সাড়ে ৯টায় তাঁদের অনুষ্ঠানে এই ভাষাসৈনিককে নিতে চান তাঁরা। বেলা ১১টায় জেলা প্রশাসক গাড়ি পাঠাবেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অতীতের কোনো সরকারই ভাষাসৈনিকদের খোঁজ নেয়নি। বছরে শুধু এই একটি দিনেই আমাদের স্মরণ করা হয়।’

রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাতের কথা শুনতে চাইলে ‘সেই চর্বিত চর্বন’ বলে কথা শুরু করেন মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জি। বলেন, তখন তিনি দশম শ্রেণিতে পড়তেন। পড়াশোনার বাইরেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ হওয়ার কারণে ছিলেন রাজনীতি সচেতন। সেই কারণে সর্বদলীয় ভাষা আন্দোলন কমিটির একজন হয়ে উঠেছিলেন তিনি। আন্দোলনটা ছিল রাজশাহী সরকারি কলেজকেন্দ্রিক। এখনকার মতো টেলিফোন ব্যবস্থা ছিল না। তখন সন্ধ্যায় ট্রেনে খবর আসত। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় তাঁরা স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। তাঁদের একজন কর্মী ট্রেন থেকে নেমে ঢাকায় মিছিলে গুলি চালানোর খবর দেন। সেই রাতেই তাঁরা রাজশাহী কলেজের নিউ হোস্টেলের পাশে ইট আর কাদামাটি দিয়ে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি ভোরবেলায় তাঁরা কাজ শেষ করে চলে যান। এরপর সকালে পাকিস্তানি বাহিনী ও মুসলিম লীগের কর্মীরা এসে শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলেন। তাঁরা মনে করেন, সেটিই দেশের প্রথম শহীদ মিনার।

রাজশাহীর ভাষা আন্দোলন কতটা বেগবান ছিল, তা স্মরণ করে তিনি বলেন, নগরের কল্পনা হলের মোড় থেকে রাজশাহী কলেজ পর্যন্ত দীর্ঘ মিছিল বের হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের সফলতার প্রসঙ্গে এই ভাষাসৈনিক বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন থেকে এত বছর হয়ে গেল! কিন্তু বাংলা সাহিত্যের যে অগ্রগতি ও উন্নতি হওয়ার কথা ছিল, তা করতে পারিনি। পৃথিবীর প্রধান ছয়টি ভাষার অন্যতম এই ভাষাকে কেন জানি না, আমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার উপযোগী ভাষা হিসেবে গড়ে তুলতে পারি নাই। অথচ চীন, জাপান, কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব ভাষায় পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখায় বিচরণ করছে। তাঁদের ভাষায় তাঁরা উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে। আমরা সেটা করতে পারি নাই। কেন করতে পারি নাই, তা গবেষণা করে দেখা দরকার। এই প্রতিবন্ধকতা দূর করে বাংলাকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষায় রূপ দেওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমার উদাত্ত আহ্বান।’

মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বাংলার প্রতি হেলাফেলার কারণে আমাদের শিক্ষার্থীরা বাংলা মাধ্যমে লেখাপড়া করেও শুদ্ধ করে বাংলা লিখতে পারে না। বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানিতে এবং বিদেশে গিয়ে অর্থ উপার্জন করার যে একটা বাসনা, তা থেকে অভিভাবকেরা সন্তানদের ইংরেজিতে জোর দেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে হয়তো তাঁদের যুক্তি, বিদেশি কোনো চাকরির ক্ষেত্রে বাংলা কাজে লাগে না। সে জন্য ইংরেজিকে উপযোগী মনে করায় বাংলাকে আমরা সেই পর্যায়ে নিতে পারি নাই। এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। প্রতিটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে অবশ্য বাংলাকে পাঠ্য হিসেবে রাখতে হবে। তা না হলে বাংলা আরও পিছিয়ে পড়বে।’

এই ভাষাসৈনিক মনে করেন, ভাষা আন্দোলনই স্বাধীনতার সূতিকাগার। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।” এখন দেখতে পাচ্ছি, এই সংগ্রাম মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আনতে পারেনি। পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল, এখনো তা রয়েই গেছে। এই বৈষম্য দূর করার জন্য যে প্রচেষ্টা বা উদ্যোগ, সেটাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও পাকিস্তানের মতো একটি ধনিক গোষ্ঠী গড়ে উঠছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা অনেক প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আমি আশা করি, তিনি এই বৈষম্য দূর করার কাজটিও করবেন।’