
মাদারীপুরে জমিজমা লিখে দেওয়ার পরও ছেলে ও তাঁর স্ত্রীর নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পাননি ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা। ভরণপোষণের জন্য মাসে মাত্র আড়াই হাজার টাকা চাওয়ায় ওই বৃদ্ধা মাকে বেধড়ক মারধর করা হয়েছে। পরে অচেতন অবস্থায় জেলা সদর হাসপাতালের সামনে ফেলে যান। গতকাল মঙ্গলবার রাতে সদর উপজেলার পেয়ারপুর ইউনিয়নের কুমড়াখালী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমড়াখালী এলাকার মৃত মোতালেব তালুকদারের স্ত্রী সার্থকবান বিবি। একমাত্র ছেলে দেলোয়ার তালুকদার, পুত্রবধূ মাকসুদা বেগম ও নাতিদের সঙ্গেই থাকতেন তিনি। দুই বছর আগে সার্থকবান স্বামীর রেখে যাওয়া ১৪ শতাংশ জমি একমাত্র ছেলে দেলোয়ারের নামে লিখে দেন। এর পর থেকে নানা বিষয় নিয়ে ছেলে দেলোয়ার ও তাঁর স্ত্রী মাকসুদা প্রায়ই মাকে মারধর করতেন। বিষয়টি স্থানীয় বাসিন্দারা জানার পর তিন মাস আগে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তাঁর থাকার জন্য ছোট একটি আলাদা ঘর করে দেওয়া হয়। ছেলে মাসে আড়াই হাজার টাকা ভরণপোষণ দেবে সালিসের মাধ্যমে সেটাও ঠিক করে দেওয়া হয়। ওই আড়াই হাজার টাকা দিয়েই ওই বৃদ্ধ নিজেই রান্না করে দুই মাস কোনোরকমে চলছিলেন। চলতি মাসের ভরণপোষণের টাকা চাওয়ায় গতকাল বিকেলে ওই বৃদ্ধাকে তাঁর ছেলে ও তাঁর স্ত্রী লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটান। পরে আহত অবস্থায় রাত একটার দিকে তাঁকে জেলা সদর হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যান তাঁরা।
আজ বুধবার দুপুর ১২টার দিকে হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, নিচতলার সার্জারি ওয়ার্ডের একটি শয্যায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন মা সার্থকবান বিবি। নার্সেরা তাঁর সেবা করছেন। আশপাশের রোগীরাও তাঁর এ পরিণতি দেখে হতবাক। সার্থকবান বিবির কাছে ঘটনা জানতে চাইলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমার একটাই পোলা। ওরে আমার নামে যতখানি জমিজমা ছিল সবই লেইখা দিছি। ওরা ছাড়া আমার আর কেউ নাই। এই মাসের খরচার টাহা চাইলে ওরা দেয় নাই, খালি মারছে।’
বৃদ্ধা সার্থকবান বিবির বড়ভাই জব্বার ব্যাপারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তিন ভাই, দুই বোন। বোনদের মধ্যে সার্থকবান বড়। তাঁর আগে সুখের সংসার ছিল। ছেলের নামে জমিজমা লিখে দেওয়ার পরই অশান্তি শুরু হয়। বোনটাকে নিয়ে আমরাও খুব দুশ্চিন্তায় আছি। এ বিষয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ দিয়েছি।’
সার্থকবানের ভাবি মনোয়ারা বেগম বলেন, একমাত্র ছেলে ও তাঁর স্ত্রী এভাবে অত্যাচার করবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের কঠিন বিচার হওয়া উচিত।
জানতে চাইলে পেয়ারপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, দেলোয়ার তাঁর মাকে আগেও মারধর করেছেন। বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকবার সালিস হয়েছে। মাসের শুরুতেই দেলোয়ারের আড়াই হাজার টাকা দেওয়ার কথা। মঙ্গলবার ৫ তারিখ ছিল, কিন্তু এখনো টাকা দেননি। ওই বৃদ্ধা আমাদেরও বিষয়টি জানান। কিন্তু পরে জানতে পারেন, টাকার জন্য আবার তাঁকে মারধর করেছেন দেলোয়ার।
মাদারীপুরের পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ঘটনার পর অভিযুক্ত দেলোয়ার ও তাঁর স্ত্রী পালিয়েছেন। এ বিষয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া ওই মা যেন স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা হবে।’