
রোববার রাত ১১টা। ব্যস্ত শহরে ধীরে ধীরে নেমে আসছে নীরবতা। সারা দিন ক্রেতায় গমগম করা দোকানগুলো একে একে বন্ধ হচ্ছে। বেশির ভাগ মানুষই ফিরে গেছেন গন্তব্যে। যাঁরা এখনো যাননি, তাঁদের চলাফেরায়ও তাড়াহুড়োর ছাপ। ফাঁকা হচ্ছে শহরের সব রাস্তাঘাট। কিন্তু ব্যতিক্রম দেখা গেল গাজীপুর শহরের রাজবাড়ি সড়কে। সড়কটিতে বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম। সড়কটিতে সারি বেঁধে বসেছে ৫০টির বেশি সবজি দোকান। সড়কবাতির আলোয় সেসব দোকানে চলছে হাঁকডাক।
কাজী মার্কেটের সামনের দোকানি মো. জাহাঙ্গীরের ভাষ্য, ‘এইড্যা গরিব মাইনষ্যের বাজার। এই বাজার চালুই হয় রাইত ১০টার পর।’ এর ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, তাঁরা দিনে নগরের বিভিন্ন এলাকায় সবজি ফেরি করে বিক্রি করেন। দিন শেষে যেসব সবজি অবিক্রীত থাকে, তা এখানে বিক্রি করেন ১০ থেকে ১৫ টাকা কমে। এ কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ প্রতিরাতে এখানে আসেন বাজার করতে। কম দামে সবজি পেয়ে খুশি হন তাঁরা।
জাহাঙ্গীর কয়েকটি সবজির দামের পার্থক্য দেখালেন। যেমন সকালে ১ কেজি পটল তিনি বিক্রি করেছেন ৫০ টাকায়। এখন তা বিক্রি করছেন ৩৫-৪০ টাকায়। সকালে প্রতি কেজি বেগুন ছিল ৭০ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। সকালে ঢ্যাঁড়স ৩০ টাকা, রাতে ১৫ টাকা। এভাবে চিচিঙ্গা, করলা, বরবটি, লতিসহ প্রায় প্রতিটি সবজিই গড়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা কমে বিক্রির কথা জানান তিনি। জাহাঙ্গীর বলেন, ‘এই বাজারে আমাগোর মূল কাস্টমারই হইল গরিব মানুষ। অনেকে প্রতিদিন বইস্যাই থাকে এই বাজারের লাইগ্যা। কমে সবজি দিতে পারলে আমাগোর খুব ভাল্লাগ্যে।’
ঘড়ির কাঁটায় রাত তখন সাড়ে ১১টা। এর মধ্যে জাহাঙ্গীরের দোকানে সবজি কিনতে এলেন সালেহা নামের একজন। আশপাশের আরও কয়েকটি দোকান ঘুরে তিনি জাহাঙ্গীরের দোকানে আসেন। বেশ কিছুক্ষণ বাছাবাছি শেষে ২ কেজি বেগুন, ১ কেজি শসা ও ১০ টাকার ধনেপাতা কেনেন তিনি। কথা প্রসঙ্গে বললেন, তাঁর স্বামী রিকশাচালক। আর তিনি কাজ করেন একটি পোশাক কারখানায়। থাকেন শহরের টাঙ্কির পাড় এলাকার একটি ভাড়া বাসায়। তাঁদের একটি ছেলেসন্তান আছে। স্বামী-স্ত্রীর আয়ে সংসার চলতে চায় না। খরচ বাঁচাতে স্বামী-স্ত্রী মিলে এ বাজারে সবজি কেনাকাটা করতে আসেন। তিনি এসেছেন এখানে, আর তাঁর স্বামী ইদ্রিস আলী গেছেন মাছের খোঁজে।
সালেহা বলেন, ‘এইখ্যানে সবজি কম দামে পাওন যায় ঠিকই, কিন্তু বাইছা নিতে অয়। ভালা সবজি আগেই বেছা হইয়্যা যায়। হেললাইগ্যা অনেকগুলা দোকান ঘুরতে অয়।’
পাশের একটি দোকানে সবজি কিনতে এসেছেন নগরের সাহাপাড়া এলাকার মো. রাজিউল ইসলাম। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তিনি। খরচ বাঁচাতে এ বাজারে আসেন। তিনি বলেন, ‘বেতন ভাই ৮ হাজার ট্যাকা। এইখান থেকে ঘরভাড়াই চইল্যা যায় সাড়ে ৪ হাজার ট্যাকা। বাকি ট্যাকায় কোনো মতেই সংসার চলে না। হেললাইগ্যা যতডা সম্ভব, চেষ্টা করি চাইপ্যা চলতে। বাজার থ্যাইকা একটা ট্যাকা বাছাইতে পারলেও আমার লাইগ্যা অনেক কিছু।’
সড়কের সবজি বিক্রেতারা বলেন, তাঁদের বাজারটি ক্ষণস্থায়ী। প্রতিদিন রাত ১০টার দিকে শুরু হয়ে চলে রাত ১২–১টা পর্যন্ত। মূলত সড়কের যান চলাচল কমার পরপরই সবজি নিয়ে বসেন বিক্রেতারা। কখনো কখনো পুলিশের ধাওয়ায় উঠে যেতে হয় তাঁদের।