
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শাহ মখদুম হলের ডাইনিংয়ে দীর্ঘ ৪২ কাজ করেছেন মজিবর রহমান (৫৯)। অমায়িক ব্যবহারের কারণে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে বেশ প্রিয় ছিলেন। চাকরি শেষে বিদায় নেওয়ার সময় হলের শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন তাঁদের প্রিয় ‘মজিবর ভাই’। গতকাল শুক্রবার হল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়েছেন তিনি। আজ শনিবার তিনি গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে পৌঁছেছেন।
মজিবরের হাতে অনুদান হিসেবে দুই লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হলের প্রাধ্যক্ষ তাঁকে পায়জামা, পাঞ্জাবি ও টুপি উপহার দিয়েছেন। হলের শিক্ষার্থীরা সব কক্ষে গিয়ে তাঁকে উপহার দেওয়ার জন্য টাকা তুলেছেন। বিদায়বেলায় অশ্রুসিক্ত মজিবর রহমান ডাইনিংয়ে তাঁর সহকর্মীদের বলেন, ‘আপনারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবেন। ভালো ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীরা মনে রাখবেন।’
হলের প্রাধ্যক্ষ মো. রুহুল আমিন বলেন, মজিবর রহমান শিক্ষার্থীদের খুব প্রিয় ছিলেন। তাঁর ব্যবহার অমায়িক। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও হল প্রশাসনের অনুদানের দুই লাখ টাকা তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
মজিবর রহমানের সঙ্গে আজ কথা হলে তিনি বলেন, আশির দশকে তাঁদের এলাকায় অভাব ছিল। কাজকর্ম নেই, কোনো রকমে দিন চলে তাঁর পরিবারের। তখন তাঁর বয়স ১৭ বছরের মতো। তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রয়াত অধ্যাপক আহমদ হোসেন তাঁকে এ চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। তখন মাসে ৯০ টাকা বেতন পেতেন। এরপর কেটে যায় চার দশক। সবশেষ তিনি ১০০ টাকা কম ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পেয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারি থেকে এই বেতন ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেলেও তিনি তা পাননি।
মজিবর রহমানের দুই মেয়ে, দুই ছেলে। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলেরও বিয়ে হয়েছে। ছোট ছেলে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে। মজিবর বলেন, রাজশাহীতে এসে অনেক পরিবর্তন দেখেছেন। আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খুব দাম ছিল। আশপাশের সবাই সালাম দিয়ে কথা বলতেন। তখন হল সংসদে ভিপি ছিল। তিনিই হলকে সুন্দরভাবে চালাতেন, প্রাধ্যক্ষকে সাহায্য করতেন। হলে কোনো পাতি নেতা ছিলেন না। আর এখন তো নেতার অত্যাচারে হলে থাকা যায় না।
হলের খাবারের মান আগের চেয়ে অনেক কমেছে বলে স্বীকার করলেন ‘মজিবর ভাই’। তিনি বলেন, ‘দেড় টাকা করে খাওয়ানো শুরু করেছিলাম। এখন তো সেটা বেড়ে অনেক টাকা হয়েছে। টাকা যত বেড়েছে, খাবারের মান তত কমেছে। হলে আগে যে পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া হতো, এখন তেমন কিছুই দেওয়া হয় না। ছাত্ররাও কিছু বলে না। এমনকি আগে ঈদের সময়ও হল বন্ধ হতো না। কী যে আনন্দ হতো! হলে হলে গরু-খাসি জবাই হতো। তখন বাড়ি যেতাম না। এখানে ঈদ করতাম।’
মজিবর রহমান রাজশাহীতে থেকে যেতে চেয়েছিলেন। এই ভেবে এখানকার ভোটারও হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘রাজশাহী আমার ভালো লাগে। কিন্তু সেখানে থাকার মতো কিছুই করতে পারিনি। এ বেতনে কী করা যেত, ভাবুন! সামান্য দুই লাখ টাকা পেতে কত দিন ঘুরতে হলো। এ কারণে লক্ষ্মীপুরে চলে এসেছি। যতটুকু জমি আছে, চাষাবাদ করব।’