
ঝালকাঠিতে লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে স্বজনেরা সুগন্ধা নদীর তীরবর্তী শহরের পৌর মিনিপার্কের কাছে রাতভর অবস্থান করেন। প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার আশায় তাঁরা পাশের টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে গতকাল শুক্রবার সারা রাত ছিলেন। আজ শনিবার সকাল হতেই ৪১ জন নিখোঁজ যাত্রীর খোঁজে শতাধিক স্বজন ভিড় করছেন নদীর পাড়ে।
গতকাল রাতে বরগুনা-২ আসনের সাংসদ শওকত হাসানুর রহমান ঝালকাঠি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ৩৬ জনের লাশ বুঝে নিয়েছেন। তাঁদের মধ্য থেকে পাঁচজনের লাশ শনাক্ত করতে পেরেছেন স্বজনেরা। তাঁরা হলেন বরগুনা সদরের রোডপাড়া গ্রামের বশির উদ্দিনের মেয়ে তাইফা আফরিন (১০), বেতাগীর কাজিরাবাদ এলাকার মো. রিয়াজ (৩৫), পাথরঘাটার আবদুর রাজ্জাক (৬২), বরগুনার আমতলী গ্রামের জাহানারা বেগম (৪৫) ও বামনা লক্ষ্মীপুরা গ্রামের সঞ্জীব হাওলাদারের ছেলে স্বপ্নিল হাওলাদার।
এখন পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের কাছে ৪১ নিখোঁজ শিশু, নারী ও পুরুষ যাত্রীর তালিকা দিয়েছেন স্বজনেরা। গতকাল সকাল থেকেই বরগুনা, পাথরঘাটা, বামনা, বেতাগীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নিখোঁজ যাত্রীদের খোঁজে দুর্ঘটনার স্থানসহ সুগন্ধা নদীর পাড়ের সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করেছেন পরিবারের লোকজন। নিহত ব্যক্তিদের খোঁজে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দুর্ঘটনাকবলিত অভিযান-১০ লঞ্চেও তল্লাশি চালিয়েছেন। দিনভর অভিযান শেষে লঞ্চটি থেকে ৩৬ জনের লাশ মেলে। সন্ধ্যায় লঞ্চটি ঘটনাস্থল দিয়াকুল থেকে শহরের লঞ্চঘাটে নিয়ে আসা হয়। এর পর থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা নদীর পাড়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিখোঁজ মানুষের স্বজনদের থাকার জন্য সুগন্ধা নদীর তীরবর্তী শহরের পৌর মিনিপার্ক–সংলগ্ন টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খান সাইফুল্লাহ তাঁদের খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করেছেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের জন্য কম্বলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আজ সকালে সুগন্ধা নদীর তীরবর্তী শহরের পৌর মিনিপার্কে গিয়ে দেখা যায়, শতাধিক মানুষ নদীর পাড়ে তাকিয়ে আছেন নতুন কোনো লাশ ভেসে ওঠে কি না, তা দেখতে। অনেকে আবার নিজেদের উদ্যোগে ট্রলার ভাড়া করে সুগন্ধা নদীতে স্বজনদের খোঁজে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বরগুনা সদরের বড় লবণঘোলা গ্রামের ফরিদা বেগমের মেয়ে পাখি বেগম (৩৫) ঢাকায় স্বামীর কাছে বেড়াতে গিয়েছিলেন। স্বামী-সন্তানকে নিয়ে অভিযান-১০ লঞ্চের নিচতলার ডেকে ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে পাখি, তাঁর স্বামী আবদুল হাকিম শরীফ ও ২ বছরের ছেলে নাছিরুল্লাহ নিখোঁজ। মেয়ে-জামাতা ও নাতিকে না পেয়ে পাগলপ্রায় ফরিদা বেগম। তিনি বিলাপ করতে করতে নদীর পাড়ে ছুটে যাচ্ছেন। তাঁর মতো আরও অনেক স্বজনের হাহাকার এখন সুগন্ধার পাড়ে।
ফরিদা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ের জামাই ঢাকায় নিরাপত্তাপ্রহরীর কাজ করে। এক সপ্তাহের জন্য মেয়ে ও নাতি তার কাছে বেড়াতে গিয়েছিল। সর্বনাশা লঞ্চ আমার কলিজার টুকরাদের কাইরা নিল। এখন যদি লাশগুলাও খুঁজে না পাই, আমি নিজেরে কী সান্ত্বনা দেব!’
বরিশাল ফায়ার সার্ভিসের পাঁচ সদস্যের একটি ডুবুরির দল ঝালকাঠির লঞ্চঘাটে পৌঁছেছে সকালে। তারা আজ সারা দিন সুগন্ধা নদীর সম্ভাব্য সব স্থানে লাশের সন্ধানে অভিযান চালাবে।
এ বিষয়ে বরিশাল ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী উপপরিচালক বেলাল উদ্দিন বলেন, সুগন্ধা নদীতে স্রোতের মাত্রা বেশি থাকায় ডুবে যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ দুর্ঘটনাস্থলের কাছে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। তারপরও ডুবুরি দলের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হবে।