কক্সবাজার শহর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে চকরিয়ায় ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের অবস্থান। পার্কের পূর্ব কোনার ৭৫ একর জায়গা ঘিরে সিংহবেষ্টনী। এই বেষ্টনীর ভেতরে টুম্পা, রাসেল, সম্রাট আর নদী নামের সিংহগুলোর বসবাস। কদিন আগেও তারা মিলেমিশেই দিন কাটাত। এখন পরিস্থিতির ভিন্ন। একে অপরের সঙ্গে খুনসুটির পাশাপাশি চলছে আক্রমণ, ঝগড়াঝাঁটি।
এই অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে গত ২৩ ফেব্রুয়ারির পর থেকে। সেদিন বেষ্টনীর জ্যেষ্ঠ বাসিন্দা সোহেলের মৃত্যু হয়।
দুই বছর ধরে সিংহগুলোর দেখভালের দায়িত্বে আছেন পার্কের প্রাণী সংরক্ষক আকতার হোসেন (৫০)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সোহেলের মৃত্যুর পর থেকে এই সিংহগুলো অন্য রকম হয়ে গেছে। সম্ভবত ‘অভিভাবকের’ চলে যাওয়া এরা (সিংহ) সহ্য করতে পারছে না। প্রায় সময় একে অপরের ওপর আক্রমণ করছে। ঝগড়াঝাঁটিও করছে। তাতে আঘাতপ্রাপ্তও হচ্ছে।
২০০১ সালের ১৯ জানুয়ারি ২ হাজার ২৫০ একর বনাঞ্চলে গড়ে তোলা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক। এর আগে ১৯৮০ সালে এটি ছিল হরিণ প্রজননকেন্দ্র। বর্তমানে পার্কে আছে জেব্রা, ওয়াইল্ড বিস্ট, জলহস্তী, ময়ূর, অজগর, কুমির, হাতি, বাঘ, ভালুক, সিংহ, হরিণ, লামচিতা, শকুন, কচ্ছপ, রাজধনেশ, কাকধনেশ, ইগল, সাদা বক, রঙিলা বক, সারস, কাস্তেচরা, মথুরা, নিশিবক, কানিবক, বনগরুসহ ৫২ প্রজাতির ৩৪১টি প্রাণী। এগুলো আবদ্ধ অবস্থায় আছে। এ ছাড়া উন্মুক্তভাবে আছে ১২৩ প্রজাতির ১ হাজার ৬৫টি প্রাণী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গুইসাপ, শজারু, বাগডাশ, মার্বেল ক্যাট, গোল্ডেন ক্যাট, ফিশিং ক্যাট, খ্যাঁকশিয়াল ও বনরুই।
৪ বছর বয়সে ২০০৪ সালে সোহেল নামের সিংহটিকে সাফারি পার্কে আনা হয়েছিল। এরপর সোহেলের সঙ্গী হিসেবে আনা হয় হীরা নামের সিংহীকে। এদের সংসারে আসে রাসেল নামের সিংহটি। এটির বয়স এখন ১৫ বছর। রাসেলকে রেখে বেষ্টনীতেই মারা যায় হীরা। এরপর সোহেলের সঙ্গী হয় নদী (১৫)। সোহেল–নদীর সংসারে আসে টুম্পা ও সম্রাট নামের দুই সন্তান। টুম্পার বয়স ১০ আর সম্রাটের ৯।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুর সময় সোহেলের বয়স হয়েছিল ২২ বছর। সোহেলের মৃত্যুর পর রাসেল, সম্রাট, টুম্পা ও নদীর আচরণে পরিবর্তন দেখছেন পার্কের কর্মীরা। তাঁরা বলছেন, বর্তমানে সিংহগুলো একে অপরের প্রতি কেমন জানি আক্রোশের মনোভাব। প্রায় সময় একে অপরের ওপর আক্রমণ করছে। চলে ঝগড়াঝাঁটি।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে সিংহবেষ্টনীতে গিয়ে দেখা গেছে, দর্শনার্থীদের তেমন চাপ নেই। বেষ্টনীর ভেতরে চলছে টুম্পার সঙ্গে রাসেলের খুনসুটি। মাঝেমধ্যে দুজনে দৌড়ঝাঁপ করছে। টুম্পা কোনো দিকে যেতে চাইলে পিছু নেয় রাসেল।
সোহেলের মৃত্যুর পর সঙ্গীহীন হয়ে পড়ে নদী নামের সিংহটি। পার্ক কর্তৃপক্ষ নদীর সঙ্গী হিসেবে কক্ষে থাকছে দিয়েছে নদীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সম্রাটকে। কিন্তু সময়টা দুজনের ভালো যাচ্ছে না। প্রায় সময় নদীর ওপর আক্রমণ করে বসে সম্রাট। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নদীর পেটে কামড় বসিয়ে দেয় সম্রাট। তাতে অসুস্থ হয়ে পড়ে নদী। এরপর থেকে নদীকে রাখা হয়েছে পৃথক আরেকটি কক্ষে।
সেখানে দেখা গেছে, কক্ষের এক কোনায় শুয়ে আছে নদী। পেটে লেগে আছে ইনজেকশনের সুই। দূর থেকে নদীকে দুর্বল মনে হচ্ছিল। আরেকটি কক্ষে হুংকার ছাড়ছে সম্রাট। মাঝেমধ্যে দেয় দৌড়ঝাঁপ।
সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক মো. মাজহারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নদীর শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে। এখন চিকিৎসা চলছে, পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত নদীকে আলাদা কক্ষে রাখা হবে।
মাজহারুল ইসলাম বলেন, সোহেলের মৃত্যুর পর সিংহগুলো খারাপ আচরণ করছে। দর্শনার্থীরা বেষ্টনীতে গেলে হুংকার ছাড়ে। তাতে দর্শনার্থীরা আনন্দ পেলেও সিংহগুলোর যন্ত্রণা বুঝতে পারে না কেউ।
পার্ক সূত্র জানায়, প্রতিদিন বিকেলবেলায় প্রতিটি সিংহকে খাওয়ানো হয় সাত কেজি করে মাংস। সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার তাদের কিছুই খেতে দেওয়া হয় না।
সোহেলের মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন চকরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভেটেরিনারি সার্জন) সুপন নন্দী। এরপর পার্কের অভ্যন্তরে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয় সোহেলকে।
সুপন নন্দী বলেন, বার্ধক্যজনিত সমস্যায় সিংহের মৃত্যু হয়েছিল। স্বাভাবিক অবস্থায় সিংহ বাঁচে ১৫ থেকে ১৮ বছর। সাফারি পার্কে মারা যাওয়া এই পুরুষ সিংহের বয়স হয়েছিল ২২ বছর। বেশ কয়েক বছর ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিল সিংহটি।
পার্ক সূত্রে জানা গেছে, তিন মাস ধরে বার্ধক্যের যন্ত্রণায় ভুগছিল সোহেল নামের সিংহটি। এরপর তাকে বেষ্টনী থেকে সরিয়ে বন্য প্রাণী হাসপাতালের কোয়ারেন্টিন শেডে রাখা হয়েছিল। শরীর এতই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে সিংহটি দাঁড়াতেও পারছিল না, শক্তি-সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছিল।
পার্কের তত্ত্বাবধায়ক মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, সোহেলের ১১ বছরের সঙ্গী নদীর বয়স এখন ১৫ বছর। তার ওপর সম্রাটের কামড়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে নদী। অন্যদিকে রাসেলের বয়সও ১৫ পেরিয়ে যাচ্ছে। দুজনের শরীরে বার্ধক্যের ছাপ না পড়লেও একটা সময় তাদেরও চলে যেতে হবে। কারণ, দুজনেরই বয়সসীমা ক্রমাগত শেষ হয়ে আসছে।