যৌন হয়রানি নিয়ে সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য নেই। নেই কোনো অভিযোগ কিংবা আবেদন।

১৫ দিনের আগের ঘটনা। সেদিন ছিল শুক্রবার। ছোট ভাই আর বড় বোন দুজন মিলে ক্যাম্পাসে ঘুরতে বের হয়েছিলেন। তাঁরা ফেরেন তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে। ক্যাম্পাসে তাঁদের নানা অশ্লীল কথা শুনতে হয়েছে। শুধু বহিরাগত নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও তাঁদের নানাভাবে কটূক্তি করেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই ছাত্রী বলেন, ‘নিজের ক্যাম্পাসে নিজেরই সেফটি (নিরাপত্তা) নাই।’
রংপুর নগরের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানকার ছাত্রীরা প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বহিরাগতদের পাশাপাশি তাঁদের সঙ্গে এ আচরণ করেন তাঁদেরই সহপাঠী ছাত্ররা। দুজন নারীনেত্রী বলেন, ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতনসহ নানা সহিংসতা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নানাভাবে সোচ্চার থাকে। কিন্তু আড়ালে পড়ে যায় যৌন হয়রানির মতো বিষয়। অথচ নারীরা প্রতিদিন নানাভাবে যৌন হয়রানি বা হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা মুখ ফুটে বলতেও চান না। অথচ এ নীরবতা থেকে বড় ধরনের অপরাধ সৃষ্টির প্রবণতা থাকে।
রংপুর নগরে যৌন হয়রানি বিষয়ে সচেতন করতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তেমন কার্যক্রম নেই। এ বিষয়ে বেসরকারি পর্যায়ের হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কর্মসূচি পালন করেন। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো তথ্য নেই। নেই কোনো অভিযোগ কিংবা ভুক্তভোগীদের আবেদন। বিশ্বব্যাপী এপ্রিল মাসজুড়ে পালন করা হয় যৌন নির্যাতন সচেতনতা মাস। তবে এ মাস ঘিরেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেওয়া হয়নি বিশেষ কোনো কর্মসূচি।
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন ছাত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে মেয়েদের পোশাক নিয়েও প্রায় সময় অশ্লীল মন্তব্য শুনতে হয়। বাড়তি ঝামেলার কারণে ছাত্রীরা প্রতিবাদ করেন না। নীরবে পথ চলেন। ছাত্রদের দ্বারা শুধু ছাত্রীরাই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন না, তালিকায় রয়েছেন একজন নারী শিক্ষকও। এসব বিষয় নিয়ে ক্যাম্পাসে শুধু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আদতে কোনো প্রতিবাদ হয়নি।
এক ছাত্রী বলেন, ২০১৯ সালে এক ছাত্রী এর প্রতিবাদ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘নিজের ক্যাম্পাস অথচ নিজেরই সেফটি নাই। বাইরের কেউ যদি উত্ত্যক্ত করত এতটা খারাপ লাগত না। বিজয় সড়ক লিখাটার ওপরে ছেলেদের গ্যাং নিয়ে বসার জায়গা করে দিয়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।’
যৌন হয়রানিসহ মেয়েদের নানা সমস্যা নিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক কাজ করছে উইমেন পিচ ক্যাফে নামে শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠন। এই সংগঠনের সভাপতি উম্মে কুলসুম বলেন, মেয়েরা দলবদ্ধ হয়ে চলাফেরা করলে হয়তো সমস্যা হয় না। কিন্তু একাকী একটি মেয়ে নির্জন রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে তাঁকে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়। কখনো পোশাক নিয়ে, আবার কখনো শরীর নিয়ে নানা ধরনের অশ্লীল মন্তব্য করা হয়। ভাবতে অবাক লাগে, যাঁরা এই কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে থাকেন, তাঁরা এখানকারই ছাত্র। তিনি আরও বলেন, বাড়তি ঝামেলার কারণে ঘটনার শিকার মেয়েরা কোনো প্রতিবাদ চান না।
এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, এ জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে মেয়েদের নিয়ে নিয়মিত আড্ডা হয়। নানা ধরনের সচেতনতামূলক কাজ করা হয় ক্যাম্পাসে। সম্প্রতি ক্যাফেটেরিয়ায় তিন মাসব্যাপী কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে। সেখানে অনেক মেয়ে যুক্ত হয়ে কাজ করেছেন। তাঁরা চান ক্যাম্পাসে আর যেন কেউ যৌন হয়রানির শিকার না হন।
জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মুনমুন আক্তার বলেন, ‘শুধু যৌন হয়রানি নিয়ে আমাদের কোনো কর্মসূচি নেই। নেই যৌন হয়রানির বিষয়ে কোনো অভিযোগও। তবে নারী নির্যাতনসহ নারীদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে জেলা উপজেলায় মাঝেমধ্যে উঠান বৈঠক করা হয়ে থাকে।’
মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর রংপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক কাওসার পারভীন বলেন, যৌন হয়রানি বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো অভিযোগ নেই। তবে এ বিষয়ে নারীদের নিয়ে দুই মাস পরপর বৈঠক হয়।
জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, এখন কর্মক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে আসছেন। তাঁদের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এই মাসে যৌন নির্যাতন সচেতনতা নিয়ে নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করবেন তাঁরা।