লোহাগড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

৫ মাস ওষুধ সরবরাহ নেই, চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত

চিকিৎসক ও নার্সরা চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনায় যেমন হিমশিম খাচ্ছেন, গরিব রোগীরাও পড়েছেন বিপাকে।

নড়াইলের লোহাগড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় পাঁচ মাস ধরে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী নেই। এতে চিকিৎসক ও নার্সরা চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনায় যেমন হিমশিম খাচ্ছেন, গরিব রোগীরাও পড়েছেন বিপাকে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কবে হবে, তা নিশ্চিত করতে পারেনি উপজেলা ও জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন।

এ সম্পর্কে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী কেনার জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন লাগে। এরপরই ঠিকাদারেরা ওষুধ কিনতে পারেন। সেই অনুমোদন না পাওয়ায় ঠিকাদারেরা ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী কিনতে পারেননি। এ জন্য এ সংকট তৈরি হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়ের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তা অনুমোদনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয় গত বছর ১৯ ডিসেম্বর। তা তখন অনুমোদন হয়নি। ১৮ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে চিঠি এসেছে, ওই দরপত্র প্রক্রিয়ায় ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকায় অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ত্রুটিগুলো সংশোধন করে আবারও পাঠাতে বলা হয়েছে। ২২ মে ত্রুটিগুলো সংশোধন করে ফাইল অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ২৩ মে অধিদপ্তর ওই ফাইল গ্রহণ করেছে।

অনুমোদন না পাওয়ায় ঠিকাদারেরা ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী কিনতে পারেননি। এ জন্য এ সংকট তৈরি হয়েছে।
আবদুল্লাহ আল মামুন, আবাসিক চিকিৎসক কর্মকর্তা

দরপত্র প্রক্রিয়ায় ত্রুটি-বিচ্যুতির বিষয়ে হাসপাতালের কর্মকর্তারা কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বলেন, হাসপাতাল থেকে নথিপত্র পাঠানো হয়। সাধারণত ঠিকাদার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যোগাযোগ করে এর অনুমোদন নিয়ে আসেন। ঠিকাদারেরা হয়তো যোগাযোগ না করায় এবার অনুমোদন হয়নি।

লোহাগড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভান্ডাররক্ষক মীনা সোহানুর রহমান গত সোমবার বলেন, হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি চাহিদা গ্যাস্ট্রিক, ডায়াবেটিস ও প্রেশারের ওষুধ। এসব রোগের কোনো ওষুধ হাসপাতালে নেই। এ ছাড়া ঠান্ডা, অ্যালার্জির জন্য হিসটাসিন ও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ এজিথ্রোমাইসিন সবচেয়ে বেশি চলে। এগুলোও নেই। প্রায় পাঁচ মাস ধরে এ অবস্থা।

মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) সুষমা মল্লিক জানান, প্রায় পাঁচ মাস ধরে হাসপাতালে রি–এজেন্ট (প্যাথলজি পরীক্ষা করার কিট) নেই। তাই সব প্যাথলজি পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। নিজের পকেটের টাকায় কিছু রি–এজেন্ট কিনে কোনো কোনো পরীক্ষা কোনোরকমে চালাচ্ছেন।

হাসপাতালের নার্স (ওয়ার্ড ইনচার্জ) পবিত্রা বিশ্বাস বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য ক্যানুলা, সিরিঞ্জ, স্যালাইন ও স্যালাইন সেট অতি প্রয়োজনীয়। অথচ তিন-চার মাস ধরে এগুলোর সরবরাহ নেই। এতে ভর্তি রোগীরা সন্দেহ করে যে আমরা ইচ্ছা করেই এগুলো দিচ্ছি না। রোগীরা খারাপ ব্যবহার করেন।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী আসে দুই উৎস থেকে। তার অধিকাংশই আসে ঠিকাদারি প্রক্রিয়ায়। এসেনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানির থেকে কয়েক প্রকারের কিছু ওষুধ আসে। প্রতিদিন ৬০-৭০ জন রোগী ওই হাসপাতালে ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগে ৩০০-৫০০ রোগী প্রতিদিন ভিড় জমান। হাসপাতালে আসা এসব রোগী অধিকাংশই গরিব পরিবারের। তাঁদের পক্ষে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী কেনা সম্ভব নয়। এতে বিপাকে পড়েছেন রোগীরা।

নড়াইলের সিভিল সার্জন নাছিমা আকতার গতকাল মঙ্গলবার বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন না হওয়ায় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ঠিকাদারেরা কিনতে পারেননি। কবে অনুমোদন হবে, তা নিশ্চিত বলতে পারছি না। তবে গত সোমবার এসেনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানির কিছু ওষুধ হাসপাতালে এসেছে।’

গত সোমবার হাসপাতালে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে দেখা গেছে, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর অভাবে চিকিৎসক ও নার্সরা চিকিৎসা কার্যক্রমে সমস্যায় পড়ছেন। লোহাগড়ার রঘুনাথপুর গ্রামের টুটুল শেখের আট বছরের ছেলে তামিমকে পেটব্যথা ও ডায়রিয়ার জন্য এ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। টুটুল শেখ বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। কাছে ছিল মাত্র ৫০০ টাকা। ওষুধ, স্যালাইন ও স্যালাইন সেটসহ সব কিছু কিনতে হচ্ছে। দোকানে বাকি রেখেছি। এ অবস্থায় কী করব ভেবে পাচ্ছি না।’