
রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন কোম্পানি যমুনা অয়েলের প্রধান স্থাপনা চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে দুটি জাহাজের ডিজেল লোপাটের ঘটনায় পাঁচ কর্মকর্তাকে ৯৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বলেছে তদন্ত কমিটি। ১৩ মাস আগে প্রতিবেদনটি দাখিল করা হয়। কিন্তু যমুনা অয়েল কোম্পানি তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর ‘হিসাবে ভুল করায় ধরা পড়ল ডিজেল চুরি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়। যমুনা অয়েল কোম্পানি এই ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি গত বছরের ১১ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করে। এতে কোম্পানি ছয়জনের মধ্যে পাঁচ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করে।
তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত পাঁচ কর্মকর্তাকে ৯৪ লাখ ৯৪ হাজার ৬৪৪ টাকা ফেরত দিতে বলা হয়। গত বছরের ১১ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিল হলেও কোম্পানি তা বোর্ড সভায় উপস্থাপন করেনি। ফলে প্রায় ৯৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়টি ঝুলে আছে।
জানতে চাইলে যমুনা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গিয়াস উদ্দিন আনচারী প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুপারিশ–সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন কোম্পানির পরবর্তী পর্ষদ সভায় উপস্থাপন করা হবে। পর্ষদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
তদন্ত প্রতিবেদনে যমুনার সহকারী মহাব্যবস্থাপক (টার্মিনাল) নুরুদ্দীন আহমেদ আল মাসুদ এবং সহকারী ব্যবস্থাপক (অপারেশন) মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাকের সাড়ে ৩২ শতাংশ করে দায় অনুপাতে প্রত্যেককে ৩০ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, সহকারী ব্যবস্থাপক প্রিয়তোষ নন্দী ২০ শতাংশ হারে ১৮ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সমীর কুমার পালের ১০ শতাংশ অনুপাতে ৯ লাখ ৪৯ হাজার এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মো. নুরুল আলমের ৫ শতাংশ অনুপাতে ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির পাঁচ সদস্য হলেন, যমুনার মহাব্যবস্থাপক মো. আইয়ুব হোসেন, কাজী মো. মনজুর রহমান, দুই উপমহাপব্যবস্থাপক হলেন মোহাম্মদ খসরু আজাদ ও মো. নাজমুল হক এবং ব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) মো. ইজাজুর রহমান। তাঁরা সর্বসম্মতভাবে প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন।
২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর চট্টগ্রামের পতেঙ্গা স্থাপনা থেকে দুটি জাহাজে করে খুলনার দৌলতপুর এবং নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় যমুনার ডিপোতে জ্বালানি সরবরাহের সময় ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৮২ লিটার ডিজেল পাচারের ঘটনা ঘটে। ওই সময় খুচরা বাজারে প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ছিল ৬৫ টাকা। ওই ডিজেল চুরির ঘটনায় সরকারের ৯৮ লাখ ৫৯ হাজার ৩৩০ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
দুটি জাহাজে মোট ৩৮ লাখ ৪২ হাজার ৯৫২ লিটার ডিজেল ভরা হয়। কিন্তু কাগজে-কলমে দেখানো হয় ৩৬ লাখ ৯১ হাজার ২৭০ লিটার। অর্থাৎ ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৮২ লিটার ডিজেল বেশি তোলা হয় জাহাজ দুটিতে। পতেঙ্গার প্রধান স্থাপনায় সংরক্ষিত রেজিস্টারে (ডিপ বুক) এবং দুটি জাহাজের চালানে (লোডিং স্লিপ) দুই রকম তথ্য উল্লেখ থাকায় বিষয়টি ধরা পড়ে।
জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ এম টি মনোয়ারায় করে ফতুল্লায় এবং এম টি রাইদায় করে খুলনার দৌলতপুরে যমুনার দুটি ডিপোতে ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর ডিজেল পাঠানো হয়। মনোয়ারা জাহাজে সংরক্ষিত চালানের (লোডিং স্লিপ) তথ্য অনুযায়ী, এতে ১৮ লাখ ৩০ হাজার ৩৬৬ লিটার ডিজেল ভরা হয়। কিন্তু পতেঙ্গার প্রধান কার্যালয়ে সংরক্ষিত ডিপ স্লিপে জাহাজটিতে ১ লাখ ৭৮২ লিটার ডিজেল কম দেখানো হয়। একই রকম জালিয়াতির ঘটনা ঘটে এম টি রাইদা জাহাজে। এই জাহাজে তোলা হয় ২০ লাখ ১২ হাজার ৫৮৬ লিটার ডিজেল। কিন্তু ডিপ বুকে ৫০ হাজার ৯০০ লিটার ডিজেল কম দেখানো হয়। ওই সময় রাইদা জাহাজ থেকে পথে পথে বিক্রি করা আট হাজার লিটার ডিজেল র্যাব জব্দ করে।