টার্মিনালে ঢোকার মুখে ১৪টি ট্রাক পার্ক করা দেখা গেলেও ভেতরের বেশির ভাগ জায়গাই ফাঁকা। অথচ এই টার্মিনালে একসঙ্গে ৪৫০টি ট্রাক রাখার ব্যবস্থা আছে।
অস্থায়ী ক্রিজে দাঁড়িয়ে ব্যাটিং করছেন দুজন। বোলিং প্রান্তে একজন। উইকেটরক্ষকসহ মাঠে ফিল্ডিং করছেন আরও ১০ জন। দুই পাশে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছেন ২০ তরুণ-যুবক। ব্যাটসম্যানের হাঁকানো চার-ছক্কায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন তাঁরা। কোনো ব্যাটসম্যান আউট হলে কারও কারও মুখে শোনা যাচ্ছে হর্ষধ্বনি।
দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে, কোনো মাঠে ক্রিকেট খেলা চলছে। কিন্তু খেলা চলছিল আসলে সিলেট কেন্দ্রীয় ট্রাক টার্মিনালের ভেতরে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে সরেজমিনে এমন দৃশ্য দেখা যায়।
টার্মিনালে ট্রাক রাখার জন্য রয়েছে নান্দনিক অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা। তবে সেখানে ট্রাক রাখেন না চালকেরা। টার্মিনালে ঢোকার মুখে ১৪টি ট্রাক রাখা দেখা গেলেও ভেতরের বেশির ভাগ জায়গাই ফাঁকা। অথচ এই টার্মিনালে একসঙ্গে ৪৫০টি ট্রাক রাখার ব্যবস্থা আছে। এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করছিলেন কিছু মানুষ। কেউ কেউ কিছুটা আড়ালে গিয়ে প্রস্রাবও করছিলেন।
টার্মিনালে পার্ক করে রাখা একটি ট্রাকের চালক মো. লায়েক প্রথম আলোকে বলেন, তিনি টার্মিনালের পাশের এলাকার এক মালিকের ট্রাক চালান। তাই নিয়মিত এখানে ট্রাকটি পার্ক করেন। গড়ে ১৩ থেকে ১৪টি ট্রাক এখানে নিয়মিত পার্ক করতে দেখেন। বাকি জায়গা একেবারেই ফাঁকা থাকে।
এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, টার্মিনালটি শহর থেকে অনেক দূরে হওয়ায় সেখানে ট্রাক পার্ক করতে চান না চালকেরা। কীভাবে টার্মিনালটি কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে ভাবা হচ্ছে।
সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, আরিফুল হক চৌধুরী মেয়র থাকাকালে প্রায় ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৩ সালের ২৩ নভেম্বর টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। এ অর্থের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ, চালকদের বিশ্রামের জন্য দোতলা ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ করা হয়। ২০১৯ সালের ১৯ অক্টোবর টার্মিনালটির উদ্বোধন করা হয়। এরপর প্রতিবছর টার্মিনালটি ইজারা দেওয়া হলেও বেশির ভাগ সময় তা অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। বিপুল টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোটি কার্যকরভাবে ব্যবহার না হওয়ায় এর উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পাঁচজন ট্রাকচালক অভিযোগ করেন, নগরের বিভিন্ন সড়কে ট্রাক রাখার কারণে যানজট ও দুর্ভোগ তৈরি হলেও কেন্দ্রীয় ট্রাক টার্মিনালটি সেই চাপ কমাতে কাজে আসছে না।
টার্মিনালটি শহর থেকে অনেক দূরে হওয়ায় সেখানে ট্রাক পার্ক করতে চান না চালকেরা। কীভাবে টার্মিনালটি কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে ভাবা হচ্ছে।আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, সিলেট কেন্দ্রীয় ট্রাক টার্মিনালের আয়তন ৮ একর ৭৭ শতক। দক্ষিণ সুরমা উপজেলার পারাইরচক এলাকায় এটির অবস্থান, যা সিলেট নগরের জিরো পয়েন্ট থেকে ৮ থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে। দূরবর্তী অবস্থানের কারণে সেখানে ট্রাক রাখতে অনেক চালকই অনাগ্রহী। এ ছাড়া টার্মিনালের আশপাশে তেমন বসতি নেই। রেস্তোরাঁ কিংবা চালকদের থাকার জন্য আবাসনের ব্যবস্থাও তেমন নেই। নিরিবিলি এলাকা হওয়ায় চালকেরা সেখানে ট্রাক রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
সিটি করপোরেশনের কর আদায় শাখা জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকায় টার্মিনালটি ইজারা পেয়েছেন আবদুল্লাহ আল মামুন নামে এক ব্যক্তি। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মেসার্স রাফা ট্রেডিংকে ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আনিকা ট্রেডিংকে ১৬ লাখ ১৫ হাজার টাকায় টার্মিনালটি ইজারা দেওয়া হয়।
কর শাখার সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত দুই অর্থবছর ধরে পবিত্র ঈদুল আজহার সময় টার্মিনাল এলাকায় অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর জন্য ১০ দিনের পৃথক ইজারা দিচ্ছে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। এ সময় টার্মিনালে কোনো ট্রাক রাখা হয় না।
টার্মিনালের অবস্থান দূরে হওয়ায় প্রত্যাশামতো ট্রাক সেখানে যাচ্ছে না। এ ছাড়া আগে নগরের বিভিন্ন সড়কে দাঁড় করিয়ে রাখা ট্রাক থেকেও ইজারাদারেরা টাকা তুলতেন, এখন সে সুযোগ বন্ধ। এ সুযোগ না থাকায় ইজারাদারেরা আগের মতো বেশি টাকায় টার্মিনাল ইজারা নিচ্ছেন না।বিশ্বজিৎ দেব, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা
চলতি অর্থবছরে টার্মিনালের ইজারাদার আবদুল্লাহ আল মামুন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, কোনো দিন ১৩ থেকে ১৪টি, কোনো দিন ২০টি, এভাবেই ট্রাক এখানে থাকে। বছর শেষে হিসাব করলে বোঝা যাবে, লাভ-লোকসান কত হলো। তবে খুব বেশি ট্রাক টার্মিনালে রাখা হয় না।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, নগরের কালীঘাট পাইকারি বাজার, কিনব্রিজ এলাকা, সোবহানীঘাট সবজি বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ট্রাক অস্থায়ীভাবে দাঁড় করিয়ে রাখেন চালকেরা। সেখান থেকেই মালামাল পরিবহন করা হয়। অতীতে টার্মিনালের ইজারাদারেরা এসব জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখা ট্রাকের কাছ থেকেও নির্দিষ্ট হারে টাকা আদায় করতেন। তবে কয়েক বছর ধরে সে সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে সিটি করপোরেশন। এখন শুধু টার্মিনালে ট্রাক রাখলে ইজারাদারেরা টাকা নিতে পারেন।
টার্মিনালে ট্রাক না আসায় লোকসানের আশঙ্কায় ইজারাদারেরাও টার্মিনাল ইজারা নিতে উৎসাহ হারাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। তাঁদের ভাষ্য, নগরের বিভিন্ন সড়কে ট্রাক রাখলেও আগে সেখান থেকে ইজারাদারেরা নির্দিষ্ট হারে টাকা আদায় করতে পারতেন। এখন টার্মিনালের বাইরে থেকে টাকা আদায়ের সুযোগ না থাকায় টার্মিনাল ইজারা নেওয়া অলাভজনক হয়ে পড়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ দেব প্রথম আলোকে বলেন, টার্মিনালের অবস্থান দূরে হওয়ায় প্রত্যাশামতো ট্রাক সেখানে যাচ্ছে না। এ ছাড়া আগে নগরের বিভিন্ন সড়কে দাঁড় করিয়ে রাখা ট্রাক থেকেও ইজারাদারেরা টাকা তুলতেন, এখন সে সুযোগ বন্ধ। এ সুযোগ না থাকায় ইজারাদারেরা আগের মতো বেশি টাকায় টার্মিনাল ইজারা নিচ্ছেন না।