খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের সংগ্রামের মোড়সংলগ্ন বাজারে চলছিল নির্বাচনী প্রচারণা। দূর থেকে প্রচার মাইকের শব্দ ভেসে আসছিল। কাছে যেতেই বোঝা গেল, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কাস্তে প্রতীকের প্রার্থীর প্রচারণা চলছে।
বুধবার বিকেলে খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনে কাস্তে প্রতীকের প্রার্থী প্রবীর কুমার মণ্ডল পথসভায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তিনি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আপনারা বিবেক-বিবেচনা করে ভোট দেবেন। বাম জোট তথা যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় গেলে দেশের মানুষের ওপর ঋণের বোঝা কমবে।’ বক্তব্য শেষে তিনি বাজার ধরে এগিয়ে যান। কারও সঙ্গে হাত মেলান, কারও হাতে তুলে দেন লিফলেট।
প্রার্থীর বহর সামনের দিকে এগোতেই বাজারের গোবিন্দ সরকারের দোকানে শুরু হয় ভোটের হিসাব-নিকাশ। চুলায় শিঙাড়া ভাজতে ভাজতে দোকানি বলেন, ‘একদিন আগে ধানের শীষ আইছিল, আজ কাস্তে আইছে। ভোটের সময় সবাই আসে। এই আসনে পাঁচটা প্রতীক—ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, লাঙ্গল, হাতপাখা আর কাস্তে। কিন্তু লড়াই হবেনে দুইজনের, ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লার।’
কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৬ আসনে অতীতে বিএনপি সাধারণত জামায়াতে ইসলামীর জন্য আসনটি ছেড়ে দিত। তবে দীর্ঘদিনের জোট রাজনীতির সমীকরণ ভেঙে যাওয়ায় এবার বিএনপি ও জামায়াত আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। ফলে বদলে গেছে নির্বাচনী চিত্র। পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে চারজনই এবার প্রথমবার সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁরা হলেন বিএনপির মনিরুল হাসান, জাতীয় পার্টির মোস্তফা কামাল, ইসলামী আন্দোলনের আছাদুল্লাহ ফকির ও সিপিবির প্রবীর কুমার মণ্ডল। একমাত্র পুরোনো প্রার্থী জামায়াতের আবুল কালাম আজাদ ২০১৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কয়রা ও পাইকগাছায় চলছে জমজমাট প্রচার-প্রচারণা। গ্রাম ও হাট-বাজারে গণসংযোগ, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়া, নদীর বেড়িবাঁধ, রাস্তাঘাট সংস্কার ও সুপেয় পানির প্রতিশ্রুতি—সব মিলিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। নারী কর্মীরাও দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে লিফলেট বিতরণ করছেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির মনিরুল হাসান ও জামায়াতের আবুল কালাম আজাদ অন্য প্রার্থীদের তুলনায় মাঠে বেশি সক্রিয়। পাইকগাছার বাসিন্দা আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘এই আসনে সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটার কম নয়, ৯৪ হাজার ৬১৩ জন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ভোটারও আছেন। সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ভোট যেদিকে বেশি যাবে, শেষ পর্যন্ত জয় তারই হবে। সামান্য ব্যবধানও ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’
বুধবার কয়রা উপজেলার বাগালী ইউনিয়নে এক উঠান বৈঠকে বিএনপি প্রার্থী মনিরুল হাসান বলেন, নির্বাচিত হলে নদীভাঙন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, ঘরে ঘরে সুপেয় পানি সরবরাহ এবং কয়রায় ২৫০ শয্যার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। কয়রা ও পাইকগাছায় বিচারিক আদালত স্থাপন করা হবে এবং সব উন্নয়ন প্রকল্প স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে। সনাতন সম্প্রদায়ের কারও সঙ্গে দলের কোনো নেতা-কর্মী খারাপ আচরণ করলে তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কারের ঘোষণাও দেন।
একই দিনে কয়রার মহেশ্বরীপুর এলাকায় নির্বাচনী সভায় জামায়াত প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বলেন, নির্বাচিত হলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, বিদ্যালয়ের পর্যাপ্ত ভবন নির্মাণ এবং চিকিৎসাসেবার ঘাটতি দূর করা হবে। তিনি আগের জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতি ও নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করে বলেন, সরকারি বাজেট লুটপাট হয়েছে। দুর্নীতিমুক্ত থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি সবাইকে নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
কয়রা উপজেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা সুজা উদ্দিন বলেন, ‘খুলনা-৬ আসন জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখান থেকে দুবার আমাদের প্রার্থী এমপি হয়েছেন। মানুষের যে সাড়া পাচ্ছি, তাতে এবারও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী জয়ী হবেন বলে আশা করছি।’
কয়রা উপজেলা বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব এম এ হাসান বলেন, ‘এই এলাকায় বিএনপির নিজস্ব বড় ভোটব্যাংক আছে। জোট রাজনীতির কারণে আগে ছাড় দিতে হয়েছে। এবার নিজস্ব প্রার্থী থাকায় আমরা সুফল পাব। নেতা-কর্মীরা মাঠে সক্রিয়। দীর্ঘদিন পর আসনটি পুনরুদ্ধারের আশা করছি।’
ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী আছাদুল্লাহ ফকির বলেন, তাঁরা নির্বাচিত হয়ে শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করতে চান। জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হলে তিনি সর্বোচ্চ ভোটে জয়ী হবেন বলে আশাবাদী।
খুলনা-৬ আসনে বিএনপি সর্বশেষ জয় পেয়েছিল ১৯৭৯ সালে। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে জয় পায় জামায়াত। অন্য নির্বাচনগুলোয় আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। আসনটিতে এবার বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৮ হাজার ৭৩৪ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৮ হাজার ৫২৪ জন, পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১০ হাজার ২০৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের একজন ভোটার আছেন।