
রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে রোগী পরিবহনে ব্যবহার হচ্ছে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, আদায় হচ্ছে বাড়তি ভাড়া।
নেই ফিটনেস সনদ আর হালনাগাদ ট্যাক্স টোকেন। অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে রোগী পরিবহন করলেও বিআরটিএতে নিবন্ধিত রয়েছে মাইক্রোবাস হিসেবে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে এসব অ্যাম্বুলেন্স। হাসপাতালে রোগী পরিবহন করা ১২টি অ্যাম্বুলেন্সের নথি যাচাই করে ৭টিরই নিবন্ধন পাওয়া গেছে মাইক্রোবাস হিসেবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগী ও মরদেহ পরিবহনে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির। তাদের ১৪০টির মতো অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৭০-এর বেশি রোগী ও মরদেহ পরিবহন করে সমিতির অ্যাম্বুলেন্স। রোগী ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগ, এসব অ্যাম্বুলেন্সে প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত জনবল নেই। লক্কড়ঝক্কড় এমন অ্যাম্বুলেন্সে রোগী পরিবহনে আদায় করা হচ্ছে নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণের মতো অর্থ।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, জরুরি বিভাগ ও অন্যান্য ফটকে দালালেরা দাঁড়িয়ে থাকেন। বাইরে থেকে কোনো অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করলে তাঁরা সেগুলো ভেতরে প্রবেশ করতে দেন না।
হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্স এলে ওই অ্যাম্বুলেন্সের চালককে হুমকি দেন মালিক সমবায় সমিতির সদস্যরা। শর্ত দেওয়া হয়, রোগী বা মরদেহ পরিবহন করতে হলে দিতে হবে সিরিয়াল। আবার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বাড়তি আদায় করে সেটির ভাগ দিতে হবে সমিতিকে।
মানুষের দুর্দশাকে পুঁজি করে মরদেহ নিয়ে ব্যবসা করার মতো জঘন্য কাজের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।আখতার কবীর চৌধুরী, সভাপতি, সুজন, চট্টগ্রাম
পুলিশ ও সমিতির নেতা-কর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, সমিতির বর্তমান সভাপতিসহ অন্যান্য পদে থাকা ব্যক্তিরা বিএনপির অঙ্গসংগঠনের সাবেক ও বর্তমান সদস্য। নিজেদের সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন তাঁরা। সরকার পরিবর্তনের পর সমিতির নিয়ন্ত্রণ নেন তাঁরা। গত বছর এই সমিতির নির্বাচন হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালের অন্তত তিনজন কর্মচারীও এই সমিতির সদস্য।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, জরুরি বিভাগ ও অন্যান্য ফটকে দালালেরা দাঁড়িয়ে থাকেন। বাইরে থেকে কোনো অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করলে তাঁরা সেগুলো ভেতরে প্রবেশ করতে দেন না। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সমিতির নেতারা। তাঁদের দাবি, যেকোনো অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারে, তাঁরা বাধা দেন না। এখন জ্বালানিসংকটসহ অন্যান্য কারণে ভাড়া বেশি নিতে হচ্ছে।
আমাদের অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। আমরা এই অ্যাম্বুলেন্সগুলোর বিষয়ে খোঁজ নেব।উথোয়াইনু চৌধুরী, বিআরটিএ চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং)
সড়কে অ্যাম্বুলেন্স, কাগজে মাইক্রোবাস
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিবন্ধন তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাইক্রোবাসের নিবন্ধন নম্বর সাধারণত ১১ অথবা ৫১ সংখ্যা দিয়ে শুরু হয়। অন্যদিকে অ্যাম্বুলেন্সের নিবন্ধন নম্বরের শুরুতে ব্যবহৃত হয় ৭১। এ ছাড়া ব্যক্তিগত মাইক্রোবাসের নম্বর প্লেটে বাংলা বর্ণমালার পঞ্চম বর্ণ ‘চ’ ব্যবহার করা হয়। তবে ভাড়ায় চালিত মাইক্রোবাসের নম্বর প্লেটে ব্যবহৃত হয় ‘ছ’ বর্ণটি।
সম্প্রতি সরেজমিনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পূর্ব গেট এলাকায় ১২টি অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এসব অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে আটটির সিরিয়াল নম্বর ছিল ১১ ও ৫১। নিবন্ধন বর্ণমালা অনুযায়ী এগুলো ব্যক্তিগত মাইক্রোবাস। বিআরটিএর তথ্যও বলছে, এর মধ্যে একটি ছাড়া বাকি সাতটি মাইক্রোবাস হিসেবেই নিবন্ধিত। এগুলোর ফিটনেস সনদ কিংবা হালনাগাদ ট্যাক্স টোকেন নেই।
বিআরটিএ চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) উথোয়াইনু চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। আমরা এই অ্যাম্বুলেন্সগুলোর বিষয়ে খোঁজ নেব।’
জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব সুশান্ত বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, মাইক্রোবাস বা অন্য কোনো গাড়িকে অ্যাম্বুলেন্সে রূপান্তর করে রোগী পরিবহন অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ।
নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণ আদায়
গত মার্চ মাসে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ফটিকছড়ি উপজেলায় লাশ পরিবহনের রসিদ প্রথম আলোর হাতে এসেছে। তাতে দেখা যায়, হাসপাতাল থেকে ফটিকছড়ি উপজেলায় ফ্রিজার ভ্যানে লাশ পরিবহন করা হয়েছে। ভাড়া আদায় করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা। এ নিয়ে সমিতির সদস্যের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডাও হয়েছে এক চিকিৎসকের।
হাসপাতালের রোগী ও লাশ পরিবহন নীতিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ফটিকছড়ি উপজেলার এসি ও ফ্রিজার ভ্যানের ভাড়া ৩ হাজার ৭১ টাকা। কোনো গলি বা গ্রামের রাস্তার ভেতরে প্রবেশ করলে এর সঙ্গে ৫০০ টাকা যোগ হবে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ভাড়া হওয়ার কথা ৩ হাজার ৫৭১ টাকা। কিন্তু আদায় করা হয়েছে দ্বিগুণের বেশি।
বাড়তি ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. নুরুল করিম। তিনি পাঁচলাইশ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব। তিনি বলেন, ‘জ্বালানিসংকটের কারণে সব দিকে খরচ বেড়েছে। আমরা বেশি নিচ্ছি, সেটা দেখা হচ্ছে, কিন্তু কী কারণে বেশি নিচ্ছি, সেটি নিয়েও কথা বলা উচিত। আমরা ভাড়া পুনর্নির্ধারণের সুপারিশ করেছি।’
সমিতির সদস্য হাসপাতালের কর্মচারীরা
চট্টগ্রাম বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির দুজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অন্তত তিনজন কর্মচারী অ্যাম্বুলেন্স সমিতির সদস্য। তবে তাঁদের নামে অ্যাম্বুলেন্সের মালিকানার তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁরা হলেন হাসপাতালের এনসিলারি ভবনের (প্রশাসনিক ভবন) ফ্লোর ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন, নিউরোসার্জারির ওটি স্টাফ মো. তানভীর ও অফিস সহায়ক সরোয়ার আলম। আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার নামে কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেই। সমিতির সদস্য হলেও আমার সেখানে কার্যক্রম নেই। আমার কাজ প্রশাসনিক ভবনে, সেখানে রোগীদের জিম্মি করে অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) কাজী সাইফুল আলম বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তবে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
মাসে লাখ টাকার চাঁদা
সমিতির সদস্যরা জানান, অ্যাম্বুলেন্স সমিতির সদস্যের মাসে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয় সমিতির তহবিলে। চাঁদা না দিলে রোগী পরিবহনের সিরিয়াল পাওয়া যায় না। এ টাকার পুরোটাই তোলা হয় সমিতির সভাপতি মো. ইউসুফ, সহসভাপতি নুরুল কবির, দপ্তর সম্পাদন মো. আলমগীরসহ অন্যদের নিয়ন্ত্রণে। মাসে চাঁদার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ টাকা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সমিতির সভাপতি মো. ইউসুফ। তিনি চকবাজার থানা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি এবং সিটি মেয়রের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, ‘টাকা সমিতির জন্য খরচ করা হয়। ১০ মাস আগে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখন সব খরচ বেড়েছে। ফলে বাড়তি নিতে হচ্ছে।’
জানতে চাইলে সিটি মেয়র ও চমেক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সভাপতি শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে একটি ভাড়ার তালিকা নির্ধারণ করে দিয়েছি। সেটি সবাইকে মেনে চলতে হবে। কেউ চাঁদাবাজি বা সড়ক দখলের চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় থানাকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সভাপতি আখতার কবীর চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের ছত্রচ্ছায়ায় এ ধরনের অনিয়ম চলে আসছে। মানুষের দুর্দশাকে পুঁজি করে মরদেহ নিয়ে ব্যবসা করার মতো জঘন্য কাজের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।