
কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) পদ থেকে জামায়াতপন্থী দুই আইনজীবীর নিয়োগ বাতিল করেছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ওই দুই আইনজীবী দাউদকান্দির এক বিধবাকে ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের অভিযোগে গ্রেপ্তার ছাত্রশিবিরের নেতা জিসান মিয়া প্রধানের পক্ষে আদালতে সরব ছিলেন। তাঁরা জিসানের পক্ষে গণমাধ্যমে বক্তব্যও দেন।
আজ বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগ (জিপি-পিপি শাখা) থেকে জারি করা এক আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। তবে তাঁদের নিয়োগ বাতিলের কোনো সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
নিয়োগ বাতিল হওয়া ওই আইনজীবীরা হলেন মো. মনির হোসেন পাটোয়ারী ও সাইদুল ইসলাম।
আইন ও বিচার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব (জিপি-পিপি) মো. ফারুক হোসাইন স্বাক্ষরিত ওই আদেশ বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর জারি করা নিয়োগসংক্রান্ত স্মারকের মাধ্যমে তাঁদের যে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছিল, সেই নিয়োগসংক্রান্ত আদেশ বাতিল করা হলো। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা ও দায়রা জজ, পাবলিক প্রসিকিউটরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার ধর্ষণের মামলায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান মিয়া প্রধানকে কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে জিসানকে কারাগারে পাঠানো হয়। ওই দিন জিসানকে আদালতে হাজির করার আগে এবং পরে দুই দফায় জিসানের পক্ষের আইনজীবী হিসেবে গণমাধ্যমকর্মীদের ব্রিফ করেন মনির হোসেন ও সাইদুল ইসলাম।
গত মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জিসানকে আদালতে হাজির করেন ডিবি পুলিশের সদস্যরা। এর আগেই বিকেল ৫টা ৮ মিনিটে আইনজীবী মনির হোসেন ও সাইদুল ইসলাম গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে দাবি করেন, ‘শিবির নেতা জিসানকে গোপনীয়তার সঙ্গে আদালতে হাজির করেছে পুলিশ। তাঁকে সামনের গেট দিয়ে প্রবেশ না করিয়ে পেছনের যেই গেট দিয়ে বিচারকেরা প্রবেশ করেন, সেই গেট দিয়ে ভেতরে নেওয়া হয়েছে। তাঁকে একটি খাস কামরায় রাখা হয়েছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। সেখানে তাঁর কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়ার পাঁয়তারা চলছে।’ পরে একই দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট আমলি আদালতের বিচারকের সঙ্গেও দেখা করেন তাঁরা। এমন পরিস্থিতির একটু পরই তাঁকে আদালতে কালো মাইক্রোবাসে করে হাজির করে ডিবি পুলিশ। পরে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
ওই দিন গণমাধ্যমকর্মীদের জিসানকে আদালতে তোলার ছবি ও ভিডিও ধারণে বাধা দেয় ডিবি পুলিশ। এ নিয়ে তাৎক্ষণিক সাংবাদিকেরা প্রতিবাদ জানান।
জিসানকে কারাগারে পাঠানোর পর মনির হোসেন ও সাইদুল ইসলাম তাঁর আইনজীবী হিসেবে আবারও গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন। তখন মনির হোসেন ও সাইদুল ইসলাম দাবি করেন, তারা গোপন সূত্রে জানতে পেরেছেন, জিসান মিয়ার কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যার কারণে তাঁরা তাৎক্ষণিক গণমাধ্যমে প্রতিবাদ জানানোর কারণে পুলিশ জিসানকে আদালতের সামনের দরজা দিয়ে হাজির করতে বাধ্য হয়েছে।
ওই দুই আইনজীবী অভিযোগ করে বলেন, জিসানকে আদালতে হাজিরের পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করা হয়েছে। পুলিশ ও ডিবির সদস্যরা অনেকটা নাটকীয় পরিবেশের মধ্যে তাঁকে আদালতে হাজির করেন। তাঁদেরও জিসানের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। তাঁরা জিসানের কাছ থেকে ওকালতনামায় স্বাক্ষরও নিতে পারেননি। এমনকি আদালতে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করারও সুযোগ পাননি।
মনির হোসেন পাটোয়ারী বলেন, ‘আমরা জানি জিসান অপহরণের শিকার হয়েছেন। এ বিষয়ে তাঁর পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে; কিন্তু তাঁকে উদ্ধারের পরপরই একজন নারীকে এনে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করা হয়েছে। পুরো ঘটনা পুলিশের সাজানো কি না, সেটি আদালতে প্রমাণিত হবে বলে আমরা আশা করি।’
এমন পরিস্থিতির দুই দিন পরই বৃহস্পতিবার কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এপিপি পদ থেকে ওই দুই আইনজীবীর নিয়োগ বাতিল করার ঘটনা ঘটেছে।
এ বিষয়ে মো. মনির হোসেন পাটোয়ারী বলেন, ‘জিসানের আইনজীবী হওয়ায় নিয়োগ বাতিলের কারণ হতে পারে বলে ধারণা করছি। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো কারণ বা উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।’
সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জিসানের পক্ষে আদালতে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেছিলাম, এ জন্য আমাদের দুজনের এপিপি নিয়োগ একসঙ্গে বাতিল হয়েছে বলে ধারণা করছি। এটি ছাড়া হুট করে আমাদের নিয়োগ এভাবে বাতিল করার অন্য কোনো কারণ দেখছি না।
কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি কাইমুল হক বলেন, আদেশের একটি অনুলিপি আমি পেয়েছি। এটি আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত। মন্ত্রণালয় প্রয়োজন মনে করলে যে কাউকে নিয়োগ করা বা নিয়োগ বাতিল করতে পারে। এর বাইরে আমি কিছু জানি না।