বগুড়া -৬ ( সদর) আসনে উপনির্বাচনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী রেজাউল করিমের সংবাদ সম্মেলন। বুধবার দুপুরে বগুড়া প্রেসক্লাবে
বগুড়া -৬ ( সদর) আসনে উপনির্বাচনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী রেজাউল করিমের সংবাদ সম্মেলন। বুধবার দুপুরে বগুড়া প্রেসক্লাবে

রাত পোহালেই বগুড়া-৬ আসনে উপনির্বাচনের ভোট, শেষ মুহূর্তে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

রাত পোহালেই বগুড়া-৬ (সদর) আসনে উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছেড়ে দেওয়া এ আসনের উপনির্বাচনে আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ করা হবে। তবে শেষ মুহূর্তে বিএনপি ও জামায়াতের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী পরস্পরের বিরুদ্ধে দফায় দফায় সংবাদ সম্মেলন করে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের তির ছুড়েছেন। ফলে শেষ মুহূর্তে এ উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণ নিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে আসনটিতে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেই সঙ্গে তিনি ঢাকা-১৭ আসনেও বিজয়ী হন। পরে তিনি বগুড়া-৬ আসন ছেড়ে দেওয়ায় এখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

বগুড়া সদর উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার ২১টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই আসন। ভোট গ্রহণের জন্য ইতিমধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী রেজাউল করিম (বাদশা) ধানের শীষ, জামায়াতের আবিদুর রহমান (সোহেল) দাঁড়িপাল্লা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির প্রার্থী আল আমিন তালুকদার ফুলকপি প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ধানের শীষের প্রার্থী রেজাউল করিম বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি। তিনি বগুড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র। আর জামায়াতের প্রার্থী আবিদুর রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনেও এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তারেক রহমানের ২ লাখ ১৬ হাজার ২৩৪ ভোটের বিপরীতে আবিদুর ৯৭ হাজার ৬২৬ ভোট পান।

বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও উপনির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মোছা. আছিয়া খাতুন বলেন, এ আসনে ভোটার ৪ লাখ ৫০ হাজার ৩০৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৯ হাজার ৯২৩ এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৩০ হাজার ৩৭৪ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১০ জন। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেবেন ৩ হাজার ৭৩৬ জন।

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল থেকে শহরের সেন্ট্রাল স্কুল মাঠ থেকে ১৫১টি ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণের সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। নির্বাচনে দুজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও ২০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া ২ হাজার ৬৫৫ জন ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা, ১ হাজার ৩৮২ জন পুলিশ সদস্য, প্রায় ২ হাজার আনসার সদস্য, ৮ প্লাটুন বিজিবি, ১০ প্লাটুন র‍্যাব, সেনাবাহিনী এবং ডগ স্কোয়াডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ১৫১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৫৩টিকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সাধারণ কেন্দ্রের চেয়ে বাড়তি নিরাপত্তা গ্রহণ করা হয়েছে।

বগুড়া সদর আসনটি জিয়া পরিবারের জন্য ‘সংরক্ষিত’ আসন হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৯ থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত আসনটি দখলে ছিল বিএনপির। ২০১৪ সালে বিএনপিবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির নুরুল ইসলাম এ আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে এ আসনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচিত হলেও শপথ নেননি। এবারের নির্বাচনে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হলেও আসনটি ছেড়ে দিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন জামায়াতের প্রার্থী আবিদুর রহমান। বুধবার দুপুরে বগুড়া শহরে নওয়াববাড়ি সড়কে জামায়াতের দলীয় কার্যালয়ে

শেষ মুহূর্তে উত্তাপ

উপনির্বাচনে সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নেওয়ার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন জামায়াতের প্রার্থী আবিদুর রহমান। বুধবার দুপুরে শহরের নওয়াববাড়ি সড়কে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি এ অভিযোগ করেন। আবিদুর রহমান জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও বগুড়া শহর শাখার আমির।
জামায়াতের প্রার্থীর সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, বিএনপি-সমর্থিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নেওয়া ও দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট লোকজনকে ভোটের দায়িত্ব দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করলেও রিটার্নিং কর্মকর্তা কোনো ব্যবস্থা নেননি। উল্টো রিটার্নিং কর্মকর্তাও বিএনপির প্রার্থীর পক্ষ নিয়েছেন।

আবিদুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, জামায়াতে ইসলামী অবাধ, সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে ভোট অনুষ্ঠানের আশায় উপনির্বাচনে অংশ নিলেও সরকারি দল প্রভাব বিস্তার করে নির্বাচনী পরিবেশ কলুষিত ও ভীতিকর এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ দলীয় প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে বারবার অভিযোগ করেও প্রতিকার মেলেনি। উল্টো বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছেন তিনি।

জামায়াতের প্রার্থীর অভিযোগ, ভোট গ্রহণের জন্য দলনিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগের দাবি জানানো হলেও ভোটে কারচুপি করতে বিএনপি-সমর্থিত ব্যক্তিদের প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে রিটার্নিং কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশন নীরব বলে জানিয়েছেন আবিদুর রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানো, নির্বাচনী এলাকায় সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করার দাবি জানানো হয়। জামায়াতের প্রার্থী বলেন, দাঁড়িপাল্লার কর্মী-সমর্থক ও ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। নির্বাচনে কালোটাকা ছড়িয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করা হচ্ছে।

বগুড়ার অতিরিক্ত নির্বাচন কর্মকর্তা ও উপনির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আছিয়া খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীর পক্ষে অভিযোগ পাওয়ার পর ১২ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয় প্রচারের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সে বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি প্রার্থী নারী ভোটারদের নিকাব খুলে ভোট দিতে বলায় প্রতিবাদে জ্যেষ্ঠ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় ঘেরাও করেন জামায়াতের নারী ভোটাররা। শহরের খান্দার এলাকায়

নিকাব খুলে ভোট দেওয়ার দাবি বিএনপির প্রার্থীর

জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিএনপির প্রার্থী রেজাউল করিম। উপনির্বাচনকে জামায়াতে ইসলামী বানচাল ও প্রশ্নবিদ্ধ করার নানা ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। সেই সঙ্গে উপনির্বাচনে নারী ভোটারদের নিকাব খুলে ভোট গ্রহণের দাবি জানান বিএনপির প্রার্থী।

পরে এ দাবির বিপক্ষে বুধবার জামায়াতের নারী কর্মীরা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন। বিকেলে জামায়াত-সমর্থিত ভোটাররা জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় ঘেরাও করে নিকাব খোলার বিষয়ে বিএনপির প্রার্থীর দাবির বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি জানান।

এর আগে ধানের শীষের প্রার্থী রেজাউল করিম বুধবার দুপুরে বগুড়া প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, নির্বাচন কমিশনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে নিকাব খুলে এজেন্টদের মুখ দেখিয়ে গোপন বুথে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন। নিকাব পরে কেউ ভোট দিতে পারবেন না। কেউ যাতে নিকাব পরে ভোট দিতে না পারেন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

জামায়াতের প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে রেজাউল করিম বলেন, এই উপনির্বাচন বানচাল ও প্রশ্নবিদ্ধ করার নানা ষড়যন্ত্র করছে জামায়াত। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগেও তারা একই ষড়যন্ত্র করেছিল, তাদের কেন্দ্রীয় নেতারা বগুড়ায় এসে একই ধরনের কথা বলেছেন। অথচ এই উপনির্বাচনে ধানের শীষে ভোট চাইতে বিএনপির কোনো কেন্দ্রীয় নেতা আসেননি। কোনো সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীও আসেননি।

রেজাউল করিম বলেন, ‘বিএনপি চায় ভয়ভীতিহীন স্বচ্ছ, অবাধ ও সুষ্ঠু হোক। প্রতিটি কেন্দ্রকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হোক। প্রয়োজনে প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দেওয়া হোক। আমরা চাই, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করুক। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট দিক।’