
সকাল গড়িয়ে দুপুর শুরু হতেই পাবনার বেড়া বাজারের এক কোণে রোজাদারদের ভিড় জমতে শুরু করে। কারও হাতে জগ–বোতল, কারও হাতে বড় হাঁড়ি। সবার চোখ বিশু ঘোষের সামনে রাখা বড় বড় পাত্রভর্তি মাঠার দিকে। আগেভাগে জায়গা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন অনেকে। কারণ একটাই, সবাইকে ইফতারের জন্য মাঠা কিনতে হবে।
পাবনার বেড়া পৌর এলাকায় প্রায় ৫৪ বছর ধরে বিশু ঘোষ নিজের হাতে তৈরি ঘি ও মাঠা ফুটপাতে বসে বিক্রি করছেন। সারা বছরই চাহিদা থাকে। তবে রমজান মাস এলে মাঠার কদর কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অনেকের কাছে ইফতার মানেই লেবু, বরফ আর বিশু ঘোষের মাঠা মিশিয়ে বানানো শরবত।
বেড়ার বিশু ঘোষের মাঠা মূলত বিশেষ ধরনের ঘোল। স্থানীয় উৎকৃষ্ট দুধ থেকে তৈরি হওয়ায় এর ঘনত্ব ও স্বাদ আলাদা। দীর্ঘদিন একই মান বজায় রাখায় ক্রেতাদের আস্থা তৈরি হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টার দিকে বাজারে বসার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মাঠা বিক্রি শুরু হয়। দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় সব মাঠা। এই সময়ের পর যাঁরা মাঠা কিনতে আসেন, তাঁদের ফিরতে হয় খালি হাতে। রমজানে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ মণ পর্যন্ত মাঠা বিক্রি হয় বলে জানান তিনি।
বেড়া পৌর এলাকার কলেজশিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই বিশু ঘোষের মাঠার কদরের কথা শুনে আসছি। আমি প্রায় ২০ বছর ধরে ইফতারে তাঁর মাঠা খাই। সারা দিন রোজা রাখার পর এক গ্লাস মাঠার শরবত খেলে শরীরটা একদম তাজা হয়ে যায়। অন্য কোথাও এমন স্বাদ পাই না।’
শুধু ইফতারেই নয়, সাহ্রিতেও রয়েছে বিশু ঘোষের পণ্যের আলাদা কদর। অনেক পরিবার সাহ্রিতে ভাতের সঙ্গে তাঁর ঘি খান। ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান বলেন, ‘সাহ্রিতে গরম ভাতের সঙ্গে বিশু ঘোষের ঘি মিশিয়ে খাওয়া আমাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। স্বাদ যেমন ভালো, তেমনি দেহে শক্তি থাকে দীর্ঘ সময়। রমজান আসার আগে তাই ঘি কিনে রাখি।’
বিশু ঘোষ বলেন, স্বাধীনতার পরের বছর থেকে বাজারের ফুটপাতে বসে ঘি-মাঠা বিক্রি শুরু করেন তিনি। সেই থেকে টানা ৫৪ বছর। তবে এই পেশায় তাঁর পথচলা তারও আগে। ঘি ও মাঠা বানানো তাঁদের পারিবারিক পেশা; বাপ-দাদারাও একই কাজ করতেন। ছোটবেলা থেকেই বাবার হাত ধরে তিনি দুধ জ্বাল দেওয়া, মাঠা বানানো আর ঘি প্রস্তুতের কৌশল শিখেছেন। জন্ম যমুনাপারের পেঁচাকোলা গ্রামে। নদীভাঙনে ষাটের দশকে পরিবার নিয়ে চলে আসেন বেড়া পৌর এলাকায়। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বাজারে বসা, আর স্বাধীনতার পর থেকে টানা ৫৪ বছর নিজের হাতে তৈরি ঘি-মাঠা ফুটপাতে বিক্রি করে আসছেন তিনি। অনেকেই পাইকারি ব্যবসার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু তিনি সীমিত পরিসরেই নিজের হাতে তৈরি পণ্য বিক্রি করেছেন। ফলে মানের সঙ্গে আপস করতে হয়নি।