
চায়ের কাপ ধুয়ে নিলেন মোহাম্মদ মেহেরাব হোসাইন (২৪)। তাতে যোগ করলেন চিনি ও আদা। এরপর জ্বলন্ত চুলা থেকে দুই কনুই দিয়ে বিশেষ কায়দায় কেটলি ধরে কাপে ঢেলে নিলেন গরম চা। চামচ দিয়ে নাড়িয়ে চা তৈরি শেষে দুই কনুইয়ের ভরেই কাপটি তুলে দিলেন ক্রেতার হাতে। এভাবে এই তরুণ চালিয়ে যাচ্ছেন নিজের ছোট্ট চায়ের দোকান। এর আয়েই চলে তাঁর সংসার।
মেহেরাবের সঙ্গে অন্যদের পার্থক্য একটাই—দুই হাতের কনুইয়ের পর আর বাকি অংশ নেই। পাঁচ বছর আগে বিদ্যুতের কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে চিকিৎসকেরা তাঁর দুই হাতের কনুই পর্যন্ত কেটে ফেলতে বাধ্য হন। সেই দুর্ঘটনার পর তিনি থেমে যাননি। দুই কনুইয়ের সাহায্যে তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন চায়ের দোকান। কোনো কোনো কাজে তাঁর পাশে থাকেন মা খাদিজাতুন কুবরা।
গত মাসে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার জোড়খালী বাজারে গিয়ে মেহেরাবের দেখা মেলে। আলাপে তিনি বলেন, মেহেরাব হোসাইন উপজেলার গুনারিতলা ইউনিয়নের মোসলেমাবাদ গ্রামের বাসিন্দা। বাবা সুলতান আহম্মেদ মেহেরাবের জন্মের আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। মা খাদিজাতুন কুবরা আর নতুন সংসার করেননি। বর্তমানে মা, স্ত্রী ও এক সন্তান নিয়ে মেহেরাবের সংসার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনিই।
প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপে মেহেরাব বলেন, বাবার অনুপস্থিতিতে দারিদ্র্যের মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি নানা কাজ করে মাকে সহযোগিতা করতেন। কখনো শ্রমিক, কখনো রাজমিস্ত্রির জোগালি, পরে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২০ সালে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। দুই হাত হারানোর পর তিনি ও তাঁর মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কিছুদিন মানুষের সহায়তায় চলেছেন। পরে ২০২৩ সালে জোড়খালী বাজারে একটি ছোট চায়ের দোকান দেন।
মেহেরাবের দোকানটি একটি বড় বটগাছের নিচে টিন দিয়ে তৈরি। দোকানে চা ছাড়াও আছে বিস্কুট, চানাচুর, বাদাম, মুড়ি, পান ও শিশুদের খাবার। বাজারে আসা মানুষজনই তাঁর প্রধান ক্রেতা।
স্থানীয় বাসিন্দা রহমত আলী, আজমল আলী খান, আব্দুর রশিদ, বিপুল মিয়াসহ কয়েকজন বলেন, ভিক্ষার পথ বেছে না নিয়ে পরিশ্রম করে সংসার চালাচ্ছেন মেহেরাব। শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি একজন স্বাভাবিক মানুষের মতোই দোকান চালাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, সরকার ও বিত্তবানদের উচিত মেহেরাবকে একটি পাকা দোকানঘর ও কিছু মূলধন দিয়ে সহায়তা করা। এতে তিনি আরও সচ্ছলভাবে পরিবার নিয়ে বাঁচতে পারবেন।
মেহেরাব বলেন, দিনে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা লাভ থাকে। এই দিয়েই সংসার চালাতে হয়। জীবনের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই তাঁর। তাঁর কথা, ‘আল্লাহ আমার হাত দুটো নিয়েছেন, কিন্তু মনোবল নেননি। হয়তো ভালো মনে করেই নিয়েছেন। এখন হাত ছাড়া সব কাজ করতে একটু সমস্যা হয়, কিন্তু মানিয়ে নিয়েছি। কোনো রকম খেয়ে না খেয়ে চলছি, তাতেই আল্লাহর রহমতে ভালো আছি।’
মা খাদিজাতুন কুবরা বলেন, ‘স্বামী হারানোর পর একমাত্র সন্তানের জন্যই বাঁচছি। ছেলেটার হাত কাটা গেলেও কারও কাছে হাত পাতিনি। আল্লাহর ইচ্ছায় এই দোকান দিয়েই আমাদের সংসার চলছে।’
মাদারগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম বলেন, শারীরিক অক্ষমতা নয়, মানসিক দৃঢ়তাই মানুষকে এগিয়ে নেয়—মেহেরাব এর বড় উদাহরণ। তিনি বর্তমানে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে তাঁর মাকেও বিধবা ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।