ঈদের আগে নতুন কাপড় হাতে পেয়ে বারবার শাড়িটা দেখছিলেন বাসুপাড়া ইউনিয়নের ইসলাবাড়ি গ্রামের এক নারী। তাঁর চোখেমুখে ছিল বিস্ময় আর আনন্দের মিশ্র অনুভূতি। বলছিলেন, ‘এভাবে বাড়িতে শাড়ি চলে আসবে, ভাবতেই পারিনি। এলাকার ছেলেপেলেরা যে এভাবে মনে রাখবে, ভালো লাগছে।’
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাসুপাড়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম ইসলাবাড়িতে এবার ঈদের আনন্দ একটু অন্য রকম। গ্রামের অসচ্ছল মানুষের ঘরে ঘরে ঈদের উপহার পৌঁছে দিয়েছেন একদল তরুণ। সোমবার বিকেল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রায় ২০০ মানুষের হাতে নতুন কাপড় ও উপহার তুলে দেন।
শুধু উপহার দেওয়া নয়, মানুষের মর্যাদা রক্ষার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা। তাই প্রকাশ্যে কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নীরবে মানুষের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে উপহার।
ইসলাবাড়ি উত্তরপাড়ার এক বাসিন্দা বলেন, ‘ঈদের আগে নতুন জামা কেনা আমাদের জন্য অনেক কঠিন। এটা কিনতে পারতাম না। এবার ঈদে নতুন জামা পরতে পারব।’
সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২২ সালে কয়েকজন তরুণ মিলে ‘ইসলাবাড়ি তরুণ স্টার’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। বাগমারার বাসুপাড়া ইউনিয়নের এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ বর্গাচাষের ওপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চিন্তা থেকেই তাঁদের এই উদ্যোগের শুরু। শুরুতে সদস্য ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন। এখন সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত আছেন প্রায় ৪০ জন তরুণ। তাঁদের বেশির ভাগই গ্রামের সন্তান। কেউ পড়াশোনা, কেউ চাকরির কারণে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকেন। নিজেদের অর্থায়নেই পরিচালনা করেন সংগঠনের সব কার্যক্রম।
ঈদের উপহার বিতরণ ছাড়াও সারা বছর নানা সামাজিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। প্রতি তিন মাস পরপর ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এনে গ্রামের মানুষকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। রোগীদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা স্বাস্থ্য রেজিস্টারও। চিকিৎসার পাশাপাশি বিনা মূল্যে ওষুধও দেওয়া হয়। এ ছাড়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় সহযোগিতা এবং অসচ্ছল পরিবারের মেয়েদের বিয়েতেও সহায়তা করে সংগঠনটি।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকার—খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করছি। ঈদুল ফিতরে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করি, ঈদুল আজহায় বস্ত্র দিই। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সংগঠনটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক। বাইরে থেকে কোনো অনুদান আসে না। আমরা যাঁরা যুক্ত আছি, নিজেদের অর্থ দিয়েই কাজগুলো করি।’
গ্রামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মো. সেকেন্দার আলী বলেন, ‘তরুণদের এই কাজ দেখে আমরা সত্যিই অভিভূত। সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি তাঁদের পাশে দাঁড়াতেন, তাহলে তারা আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারত। এই ছেলেদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।’