
এইচএসসি বিভিন্ন ব্যাচের সহপাঠীরা মঞ্চে উঠে কলেজজীবনের নানা ঘটনার স্মৃতিচারণা করছিলেন। সামনে চেয়ারে বসে অনেকে তন্ময় হয়ে তা শুনেছিলেন। কেউ কেউ সামনের মাঠে দাঁড়িয়ে, গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন, খুনসুটি করছিলেন। কেউ কেউ সেলফি তুলছিলেন।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কুলাউড়া সরকারি কলেজে গতকাল শনিবার পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে দিনভর এভাবেই সময় কাটান প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। কুলাউড়া সরকারি কলেজ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। ১৯৬৯ সালে এ কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো এ আয়োজন করা হয়।
গতকাল রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে কলেজ ক্যাম্পাসে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হয়। আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ও কলেজের অধ্যক্ষ মুহম্মদ আলাউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগতিক বক্তব্য দেন পুনর্মিলনী প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ও কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সৌম্যপ্রদীপ ভট্টাচার্য। শুরুতে প্রতিষ্ঠানের প্রয়াত সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর স্মরণে শোক প্রস্তাব গ্রহণ এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় দোয়া হয়। এরপর শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণা শুরু হয়। দুপুরে প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সম্মাননা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আয়োজক কমিটির সদস্যসচিব সুফিয়ান আহমদ।
কলেজের ১৯৭২ সালের এইচএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন খন্দকার লুৎফুর রহমান। তিনি বলেন, কুলাউড়া কলেজ প্রতিষ্ঠাকালে আশপাশের বড়লেখা, জুড়ী ও রাজনগর উপজেলায় কোনো কলেজ গড়ে ওঠেনি। এসব এলাকার শিক্ষার্থীরা কুলাউড়া কলেজেই পড়তেন। তখন ভালো যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না। বাস-ট্রেনে করে, কেউ হেঁটে কলেজে যাতায়াত করতেন। সে সময় কলেজে ৭০০ থেকে ৮০০ শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সময়ে মোবাইল ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। সহপাঠীদের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র ঠিকানা ছিল এ কলেজই। কলেজে লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চলত। এখন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কমে গেছে। রাজনীতিতেও অসহিষ্ণু পরিবেশ। আগে এমনটা ছিল না।’
১৯৮৭ সালে এ প্রতিষ্ঠান থেকে এইচএসসি পাস করেন রাহাত আরা বেগম। তিনি বর্তমানে কুলাউড়া পৌর শহরে অবস্থিত লস্করপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সহপাঠী ও চাচাতো বোন রুবিনা বেগমকে নিয়ে মঞ্চের সামনের চেয়ারে পাশাপাশি বসা ছিলেন। রাহাত আরা বললেন, ‘আমাদের ব্যাচের কয়েকজন ছেলে বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো। মেয়েবন্ধুদের কেউ আসেনি। তাদের কেউ বিদেশে, কেউ কেউ ঘরসংসার নিয়ে ব্যস্ত। তবে তাদের মিস করছি।’
১৯৭৯ সালে এইচএসসি পাস করার পর আর কলেজে যাননি বেসরকারি একটি সংস্থার অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাসান ইকবাল নেওয়াজের। তিনি বলেন, ‘প্রায় ৪০ বছর পর এলাম। দুই সহপাঠীকে পেয়ে আড্ডা দিলাম, একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেলাম। অনেক স্মৃতি মনে হলো। মনে হচ্ছে, পুরোনো দিনে ফিরে গেছি।’
অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক ও প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মুহম্মদ আলাউদ্দিন খান বলেন, ‘এ সংগঠনের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো, বর্তমান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মেলবন্ধন সৃষ্টি। এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকুক—এটাই প্রত্যাশা।’
আয়োজকেরা বলেন, পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ৯৭৬ জন প্রাক্তন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেন। রাত আটটার দিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয় শিল্পীরা সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন। এরপর জনপ্রিয় ব্যান্ড স্বরূপ ও অ্যাশেজ কনসার্টে গান পরিবেশন করে।