এবারের বোরো মৌসুমে আকস্মিক বৃষ্টিতে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন মহরম আলী খান। তাঁর একমাত্র ভরসা এখন কাঠের দোকানটি। বুধবার হবিগঞ্জ শহরে
এবারের বোরো মৌসুমে আকস্মিক বৃষ্টিতে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন মহরম আলী খান। তাঁর একমাত্র ভরসা এখন কাঠের দোকানটি। বুধবার হবিগঞ্জ শহরে

‘ইবার বছর তো নিজেরাই খাইতে পারতাম না, ধান বেচতাম ক্যামনে’

খোয়াই নদজুড়ে এখন বইছে ঘোলা পানি। বর্ষা মৌসুমের ঠিক আগে আগে উজানের ঢলে নদ এভাবে জেগে উঠেছে। তবে গতকাল বুধবার সকালে তখনো পুরোপুরি সরব হয়নি হবিগঞ্জ শহর। এমন সময়ে নিজের কাঠের দোকান খুলে বসেছিলেন ৬২ বছর বয়সী মহরম আলী খান।

খোয়াই নদঘেঁষা হবিগঞ্জ শহরের প্রান্তে নামহীন দোকানটিতে কাঠের চেয়ারে বসেছিলেন মহরম আলী। তাঁর ঠিক সামনেই কাঠে পেরেক ঠুকে ঠুকে নৌকা বানানোর কাজ করছিলেন বৃদ্ধ এক কারিগর। তাঁকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন মহরম। এবার বৈশাখের আকস্মিক বৃষ্টিতে তাঁর প্রায় পাঁচ কিয়ার (প্রতি কিয়ারে ৩০ শতাংশ) জমির পাকা ধান ডুবেছিল কালারডুবা হাওরের পানিতে। উঁচু তিন কিয়ার জমি থেকে যা ধান পেয়েছেন, তাঁর হিসাবে সাকল্যে তা ৪৫ মণ হতে পারে। অথচ গত বছর ১০০ মণের বেশি ধান উঠেছিল তাঁর গোলায়।

মহরমের দাবি, এই ফসলে তাঁর ছয় সদস্যের পরিবারের বার্ষিক খাবারের জোগানও হবে না, বিক্রি তো দূরের কথা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহরম বলছিলেন, ‘এক আল্লাহ জানেন, ক্যামনে পাড়ি দিতাম ইবার বছর, নিজেরাই তো খাইতে পারতাম না, ধান বেচতাম ক্যামনে?’

এ কারণে চলতি বছর বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন সদর উপজেলার হবিগঞ্জ পৌর এলাকার উমেদনগরের এই বাসিন্দা। তাঁর একমাত্র ভরসার জায়গা কাঠের দোকানটি। বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে সেখানে নৌকা তৈরি করছেন। বাকি সময় কাঠ বা অন্য আসবাব বিক্রি করেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন আকারের ৮ থেকে ১০টি নৌকা প্রস্তুতও রেখেছেন। এগুলো বিক্রি করে সারা বছর চলতে হবে। কাঠের মানভেদে নৌকাগুলোর দাম ৬ থেকে ১২ হাজার টাকা। একেকটি থেকে তাঁর মোটামুটি ৫০০–৭০০ টাকা লাভ হয়। কাঠসহ অন্য সরঞ্জাম ক্রয়সহ কারিগরের মজুরি, দোকানের ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ বাদে যা থাকে, তা দিয়ে কোনো রকম চলতে পারেন।

কথায় কথায় জানা যায়, মহরমের আগে তাঁর বাবা ফজর আলী খান প্রায় ৩৫ বছর কাঠের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। উত্তরাধিকারসূত্রে পেশাটির সঙ্গে মহরমের ছেলে নাইম খান জড়িয়ে পড়েন। তিনিও পূর্বপুরুষদের এই ব্যবসা সামলান বাবার সঙ্গে।

এর মধ্যে চেঁচিয়ে উঠলেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বয়স্ক কারিগর। তিনি বলেন, ‘অন্য খিছু না খইরা উপায় আছেনি? আমার তো জমিজমা নাই। তয় যাগো আছে, তাগো ইবারের মতোন ক্ষতি আমরা দেখছি না।’ তাঁর কথায় সায় দিলেন মহরম আলী। তিনি বলেন, ‘ছুডু বেলায় বৈশাখে এমন ক্ষয়ক্ষতি হইছিল।’ ওই সময় নিজের বয়স সাত ছিল বলে তিনি জানান।

মহরম আলীর দাবি, ব্যবসা নয়, তাঁর আয়ের প্রধান মাধ্যম এই ধান। এ অঞ্চলে বছরে একবারই ধান ফলানো যায়। তবে চলতি বছরের টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় হবিগঞ্জসহ হাওর এলাকার অধিকাংশ বোরো ধান। মহরম আলী জানান, ডুবে যাওয়া পাকা ধান দেখে তাঁর বুক ভেঙে যাচ্ছিল। তিনি বুঝে যান, আর কোনো উপায় নেই। শ্রমিকসংকটের কারণে শেষ পর্যন্ত ওই পাঁচ কিয়ার জমির একটি ধানও ঘরে তুলতে পারেননি।

হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে হবিগঞ্জে ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৪৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমির। এর মধ্যে জেলার প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ২৩ হাজার ৯০৪ কৃষক। তবে এখনো কেন্দ্র সরকারের সহায়তা পাননি তাঁরা।

স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার তিন মাস মেয়াদি মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা প্রতি মাসে ৭ হাজার ৫০০ টাকা, মাঝারি ক্ষতিগ্রস্ত ৫ হাজার টাকা ও কম ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পেতে পারেন। পাশাপাশি প্রত্যেককে ২০ থেকে ৩০ কেজি চাল দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পাশাপাশি আগামী মৌসুমে কৃষকদের সার, বীজ ও কৃষি উপকরণ সহায়তা দেওয়ার কথাও ভাবছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।

সরকারি সহায়তার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্লিপ্তভাবে জবাব দেন মহরম আলী, ‘ইতা কি আর আমরা পাইতাম! কেউ নামও লিখে নিয়ে যায় নাই।’