চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা সৈকতে মানুষের ঢল নামে
চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা সৈকতে মানুষের ঢল নামে

ঈদের ছুটি

সাদা বাঘ দেখা, সমুদ্রের পাড়ে কাঁকড়া ভাজা আর বেসক্যাম্পের মজা নিতে যেখানে যাবেন

বিকেলের নরম রোদ। সামনে বিস্তীর্ণ সমুদ্র। দূরে উড়ছে পাখির ঝাঁক। বাতাসে ভেসে আসছে কাঁকড়া ভাজা আর ঝালমুড়ির ঘ্রাণ। এ চিত্র চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সৈকতের। ঈদের ছুটিতে নগরবাসীর ভিড় জমে এখানেই।

সৈকতজুড়ে আছে হাঁটার প্রশস্ত পথ, বসার জায়গা আর ফুডকোর্ট। সন্ধ্যার পর রঙিন আলোয় পুরো এলাকা যেন আরও প্রাণ ফিরে পায়।

পতেঙ্গায় যেতে পারেন দুই পথে। মুরাদপুর থেকে আগ্রাবাদ, বন্দর ও ইপিজেড হয়ে সরাসরি পৌঁছে যাওয়া যায় সৈকতে। আবার মেরিন ড্রাইভ ধরে গেলে পুরো পথেই পাশে থাকবে সাগরের জলরেখা। ঢেউ আর পাথরের মিতালি দেখতে দেখতে কখন যে গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন, টেরই পাবেন না।

চট্টগ্রাম শহরের এক পাশে পাহাড়। অন্য পাশে সমুদ্র। তাই একটু অবসর পেলেই এই শহর যেন ডাক দেয় ঘুরে বেড়াতে। অবশ্য শুধু পতেঙ্গা নয়, ঈদের ছুটিতে পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন কাছাকাছি আরও নানা পর্যটনকেন্দ্রে। কোথাও আছে ঢেউয়ের গর্জন। কোথাও পাহাড়ের নীরবতা। কোথাও আবার সবুজের শান্ত ছায়া।

শহরের উত্তর প্রান্তে ভাটিয়ারীর সানসেট পয়েন্ট এখন অনেকের প্রিয় জায়গা। পাহাড় আর হ্রদ মিলে সেখানে তৈরি হয়েছে ছবির মতো দৃশ্য। বিকেলে সূর্য যখন ধীরে ধীরে ডুবে যায়, লালচে আলো পাহাড়ের গায়ে পড়ে তৈরি করে অন্য রকম আবহ। নিরিবিলি সময় কাটাতে চাইলে জায়গাটি হতে পারে আদর্শ। পাশে আছে ভাটিয়ারী হ্রদও।

রোমাঞ্চে ভরা ফয়’স লেক

পাহাড়ের সবুজ ছায়া আর শান্ত হ্রদ ঘেরা ফয়’স লেক অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ঈদের ছুটিতে হয়ে ওঠে সরগরম। শিশু-কিশোর থেকে বড়রা—সব বয়সী দর্শনার্থীর ভিড় থাকে এখানে। এবারও ঈদ ঘিরে নানা আয়োজন করেছে পার্ক কর্তৃপক্ষ। আছে বাম্পার কার, ফ্যামিলি রোলার কোস্টার, পাইরেট শিপ, ফেরিস হুইলসহ নানা রাইড। ছোটদের জন্য রয়েছে হ্যাপি জাম্প, সার্কাস ট্রেন, বাম্পার বোটস ও বেবি ড্রাগন।

ফয়’স লেকের বড় আকর্ষণ এখন ‘বেসক্যাম্প’। এখানে আছে ট্রি টপ অ্যাকটিভিটি, কায়াকিং, টিম গেমসহ নানা অ্যাডভেঞ্চার আয়োজন। যাঁরা একটু রোমাঞ্চ পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য জায়গাটি হতে পারে দারুণ অভিজ্ঞতা।

পাশেই রয়েছে সি ওয়ার্ল্ড ওয়াটার পার্ক। ওয়েভ পুল, মাল্টিস্লাইড আর ড্যান্সিং জোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারেন অনায়াসে। ফয়’স লেক কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, ঈদের দিন বেলা দুইটা থেকে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হবে ফয়’স লেক কমপ্লেক্স। পরদিন থেকে সকাল নয়টা–রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকবে পুরো বিনোদনকেন্দ্র। তিনি বলেন, ঈদের ছুটিতে পরিবার ও শিশুদের কথা মাথায় রেখে নেওয়া হয়েছে বাড়তি প্রস্তুতি। থাকছে বিভিন্ন রাইড, ওয়াটার পার্ক ও বিনোদনের নানা আয়োজন।

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় দেখা মিলবে সাদা বাঘের

চিড়িয়াখানায় উৎসবের আমেজ

ফয়’স লেকের পাশেই চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে উঠলেই দেখা মিলবে বাঘ, সিংহ, হরিণ, ময়ূর কিংবা কুমিরের। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় এখন প্রায় ৭০ প্রজাতির ৫২০টি পশুপাখি রয়েছে।

ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসেন হাজারো মানুষ। শিশুদের কাছে জায়গাটি বাড়তি আনন্দের। বাঘশাবকের দৌড়ঝাঁপ কিংবা পাখির কিচিরমিচির সহজেই মন ভালো করে দেয়।

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদ উপলক্ষে পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তায় বাড়তি নজর রাখা হয়েছে। টিকিটের দাম রাখা হয়েছে ৭০ টাকা।

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর মো. শাহাদাত হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ঈদের দিন সাধারণত দর্শনার্থীর চাপ কিছুটা কম থাকে। তবে পরদিন থেকেই চিড়িয়াখানায় ভিড় বাড়তে শুরু করবে। বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের উপস্থিতি বেশি থাকে।

পারকির পথে

আনোয়ারার পারকি সৈকত এখন চট্টগ্রামের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। কর্ণফুলী টানেল চালুর পর যাতায়াতও অনেক সহজ হয়েছে। এখন অল্প সময়েই পৌঁছে যাওয়া যায় সৈকতে।

এক পাশে ঝাউবন। অন্য পাশে লোনাপানির ঢেউ। বিকেলে সূর্যাস্তের সময় পুরো সৈকত যেন অন্য রকম সৌন্দর্যে ভরে ওঠে। সমুদ্রপাড়ে বসে ঝালমুড়ি খেতে খেতে শুনতে পারেন ঢেউয়ের শব্দ।

সৈকতের পাশে আছে ছায়াঘেরা বসার জায়গা। খাবারের দোকানেও মিলবে কাঁকড়া ফ্রাই, শুঁটকি, মাছের ভর্তা কিংবা ডাবের পানি।

হাতে সময় একটু বেশি থাকলে শহরের বাইরেও ঘুরে আসতে পারেন। যেতে পারেন বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত, সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক, মহামায়া লেক, নাপিত্তাছড়া ট্রেইল, খৈয়াছড়া ঝরনা কিংবা সুপ্তধারা ও সহস্রধারা ঝরনায়।

ফয়’সলেকের সি ওয়ার্ল্ড ওয়াটার পার্ক

ফটিকছড়ির হাজারীখিল অভয়ারণ্যও হতে পারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। গহিন সবুজ আর পাহাড়ি পথ আপনাকে নিয়ে যাবে প্রকৃতির আরও কাছে। চাইলে শহর থেকে একটু দূরে কাপ্তাই হ্রদেও কাটিয়ে আসতে পারেন একটি দিন। পাহাড়ঘেরা নীল জলরাশি আর নৌকাভ্রমণ এনে দেবে অন্য রকম প্রশান্তি।

ঘুরে বেড়ানো নিয়ে কথা হয় পাঁচটি আট হাজার মিটার উচ্চতার পর্বত জয় করা পর্বতারোহী বাবর আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি আর একঘেয়েমি দূর করতে ঘুরে বেড়ানোর বিকল্প খুব কম। পরিচিত পরিবেশের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো জায়গায় কিছু সময় কাটালে মন অনেকটাই হালকা হয়ে আসে। পাহাড়, সমুদ্র, ঝরনা কিংবা সবুজে ঘেরা নিরিবিলি পরিবেশ মানুষের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

বাবর আলী বলেন, প্রকৃতির কাছাকাছি গেলে দুশ্চিন্তা কিছুক্ষণের জন্য হলেও দূরে সরে যায়। মন শান্ত হয়। নতুন পরিবেশ মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে ভ্রমণ সম্পর্কও আরও গভীর করে। তাঁর ভাষায়, ঘুরে বেড়ানো শুধু বিনোদন নয়, এটি মানসিক প্রশান্তিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।