পাইকার আসছে না। তাই পরিপুষ্ট তরমুজ নিয়ে বিপাকে চাষি। সোমবার বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী এলাকায়
পাইকার আসছে না। তাই পরিপুষ্ট তরমুজ নিয়ে বিপাকে চাষি। সোমবার বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী এলাকায়

ক্রেতাসংকটে দুশ্চিন্তায় দক্ষিণের তরমুজচাষিরা

খরা আর লবণাক্ততার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই পেরিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মাঠজুড়ে এখন তরমুজের সমারোহ। সবুজ লতার বুক চিরে পরিপুষ্ট তরমুজ যেন হাসিমুখে উঁকি দিচ্ছে চারদিকে। অনুকূল আবহাওয়ায় এ বছর ফলেছে বাম্পার ফলন, তাই ভালো দামের আশায় বুক বেঁধেছিলেন চাষিরা। কিন্তু হঠাৎই পাইকারের অভাবে সেই রঙিন স্বপ্নে নেমেছে অনিশ্চয়তার ছায়া—হাসির বদলে এখন উদ্বেগ আর হতাশাই ঘিরে ধরছে এ অঞ্চলের তরমুজচাষিদের।

এবার উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক চরাঞ্চলে ব্যাপক তরমুজের আবাদ হয়েছে। এতে এবার দক্ষিণাঞ্চলের তরমুজের চাহিদা অনেকটা কম।
এস এম মাহবুব আলম, সহকারী পরিচালক, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বরিশালসহ দক্ষিণ উপকূলের ফসলি জমি লবণাক্ততা, খরা ও অতিবৃষ্টির কবলে পড়ে কৃষি খাতে বেশ কয়েক বছর ধরে মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় কৃষকেরা টিকে থাকার লড়াইয়ে লবণাক্ত ও খরাপ্রবণ জমিতে প্রায় এক দশক ধরে তরমুজ আবাদে ঝুঁকেছেন। প্রতিবছরই তরমুজ চাষের আওতা বাড়ছে। কখনো অনুকূল আবহাওয়ায় লাভের মুখ দেখছেন, আবার কখনো অসময়ের ঝড়-বৃষ্টিতে লোকসানের ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে কৃষকদের। এবার খরা থাকলেও অসময়ে ঝড়-বৃষ্টি না হওয়ায় বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু পাইকার না থাকায় তরমুজ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। এতে লোকসানের আশঙ্কায় হতাশা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক চরাঞ্চলে ব্যাপক তরমুজের আবাদ হয়েছে। এতে এবার দক্ষিণাঞ্চলের তরমুজের চাহিদা কমেছে।

চলতি বছর বরিশাল বিভাগে ৭০ হাজার ৩৬২ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৫৫ টন করে মোট ৩৮ লাখ ২১ হাজার ৭২৯ টন তরমুজ উৎপাদন হবে বলে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা আশা করছেন।

পেকে গেছে তরমুজ। কিন্তু ক্রেতাসংকটে কৃষকেরা তা তুলছেন না। সোমবার বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী এলাকায়

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, এবার বিভাগে সবচেয়ে বেশি তরমুজ আবাদ হয়েছে পটুয়াখালী জেলা—৩৫ হাজার ৫৭ হেক্টর জমিতে। এরপর ভোলায় ১৯ হাজার ৭৫৩ হেক্টর, বরগুনায় ১২ হাজার ৩২৪ হেক্টর, বরিশালে দুই হাজার ৭০৫ হেক্টর, পিরোজপুরে ৩৯৬ হেক্টর ও ঝালকাঠিতে ১২৭ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে।

বরগুনার আমতলী উপজেলায় এ বছর ৪ হাজার ২৪৯ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা ছাড়িয়ে ৪ হাজার ৩০৯ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎপাদিত তরমুজ প্রায় ২৭০ কোটি টাকায় বিক্রির লক্ষ্য ছিল। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই বড় ক্রেতার অভাবে বাজারে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

আমতলীর বিভিন্ন গ্রামের চাষিরা জানান, প্রতিবছর বড় ব্যবসায়ীরা আমতলীর তরমুজ কিনে নাটোর, দিনাজপুর, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করতেন। কিন্তু এ বছর উত্তরাঞ্চলে চাহিদা কম থাকায় বড় ব্যবসায়ীরা তরমুজ কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

গত সোমবার আমতলীর হলদিয়া, চাওড়া, আঠারোগাছিয়া ও গুলিশাখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক খেতে তরমুজ পেকে গেলেও ক্রেতাসংকটে কৃষকেরা তা তুলছেন না। কোথাও কোথাও তরমুজ কেটে খেতে ফেলে রাখতে দেখা গেছে।

হলদিয়া গ্রামের চাষি আল আমিন জানান, প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে তিন হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। কিন্তু ক্রেতা না থাকায় বিক্রি করতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে বিনিয়োগের টাকাও উঠবে না বলে আশঙ্কা তাঁর।

চাওড়া ইউনিয়নের পাতাকাটা গ্রামের চাষি মামুন মোল্লা বলেন, গত কয়েক বছর দেশের বিভিন্ন এলাকার বড় বড় ব্যবসায়ী এখানে এসে খেত থেকে তরমুজ কিনে ট্রাকে করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতেন, কিন্তু এবার তাঁরা আসছেন না। এতে স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

আমতলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাসেল বলেন, এ বছর তরমুজের উৎপাদন ভালো হয়েছে। তবে বাজারদর কম থাকায় চাষিরা কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উপজেলায় তরমুজচাষিরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন। তাঁরা বড় ব্যবসায়ীদের তরমুজ কিনতে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

শুধু আমতলী নয়, পটুয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায়ও একই অবস্থা বিরাজ করছে বলে জানা গেছে। এতে স্থানীয় চাষিদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের চরচান্দুপাড়া গ্রামের কৃষক ফেরদৌস তালুকদার জানান, চলতি বছর তিনি ৬৪ বিঘা জমিতে তরমুজ আবাদ করেছিলেন। এখন পর্যন্ত তাঁর প্রায় ২১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ফলন মোটামুটি ভালো হলেও বাজারে সঠিক মূল্য না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তিনি।

ফেরদৌস তালুকদার বলেন, গত বছর যেখানে দুই গাড়ি তরমুজ প্রায় ৯ লাখ টাকা বিক্রি হয়েছিল, সেখানে এবার ২ লাখ টাকাও পাওয়া যাচ্ছে না। ২ হাজার ২০০ টাকা মণ দরের তরমুজ ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। পাইকার না আসা এবং মোকামে চাহিদা কমে যাওয়ায় অন্তত ১২ লাখ টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি।

কলাপাড়া কৃষি কার্যালয় সূত্র জানায়, এ বছর কলাপাড়ায় প্রায় তিন হাজার চাষি ৪ হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন। তবে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্ধেক চাষি লোকসানে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বরিশাল বিভাগের অন্য জেলাগুলোতে খবর নিয়েও একই চিত্র দেখা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী। নদীবেষ্টিত এ অঞ্চলে দীর্ঘ সময় জমি পানির নিচে থাকা এবং নদীর জোয়ার-ভাটার ফলে পলিমাটি জমে উর্বরতা বাড়ে। ফলে তুলনামূলক কম সার ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া যায়।

দেশে কৃষিপণ্য বিপণনের দায়িত্বে আছে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। জানতে চাইলে বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এস এম মাহবুব আলম প্রথম আলোকে বলেন, এবার উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক চরাঞ্চলে ব্যাপক তরমুজের আবাদ হয়েছে। এতে এবার দক্ষিণাঞ্চলের তরমুজের চাহিদা অনেকটা কম। তবে এখন মৌসুম কেবল শুরু হয়েছে। যাঁরা আগাম তরমুজ উৎপাদন করেছেন, তাঁদের কিছুটা সমস্যা হতে পারে। তবে দিন যত যাবে, তরমুজের চাহিদা তত বাড়বে।