গভীর সমুদ্র থেকে নির্জন সৈকতে উঠে এল ‘অলিভ রিডলে’ প্রজাতির কচ্ছপটি। সমুদ্রের পানি থেকে ৪০-৫০ ফুট ওপরে বালুচরে পা দিয়ে একটি গর্ত খুঁড়ল। তারপর সেই গর্তে প্রায় এক ঘণ্টায় একে একে ১২৫টি ডিম দিল। কিছুক্ষণ পর বালু দিয়ে গর্তে ডিমগুলো চাপা দেয় কচ্ছপটি। এরপর ধীরে ধীরে সমুদ্রের পানিতে নেমে অদৃশ্য হয়ে যায়।
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের প্যাঁচারদ্বীপ সমুদ্র সৈকতে গত বুধবার চাঁদনী রাতে দেখা যায় এই দৃশ্য। কচ্ছপের ডিম পাড়ার দুর্লভ দৃশ্যটি পযবেক্ষণ করেন বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ও সমুদ্রবিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার, সৈকতের পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্টের (নেকম) কক্সবাজারের ব্যবস্থাপক আবদুল কাইয়ূম।
বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে কচ্ছপের ডিম পাড়া শুরু হয়। চলে মার্চ পর্যন্ত। কিন্তু গত ডিসেম্বর মাসে সেন্ট মার্টিন, সোনাদিয়া দ্বীপসহ কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার সৈকতে কচ্ছপের ডিম পাড়ার দৃশ্য চোখে পড়েনি।
প্যাঁচারদ্বীপ সৈকতে কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করে তা থেকে বাচ্চা ফোটানোর জন্য নেকমের একটি হ্যাচারি আছে। ১২৫টি ডিম সেই হ্যাচারিতেই প্রজননের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। কচ্ছপের ডিম যেন কুকুর, গুঁইসাপ খেয়ে না ফেলে, কিংবা ডিম যেন চুরি না হয়, সে জন্য নেকমের পাহারা দল রাখা হয়। তিন মাস পর এই ডিম থেকে জন্ম নেবে বাচ্চা। তখন দুই থেকে তিন দিন বয়সী কচ্ছপের বাচ্চাগুলো সমুদ্রে অবমুক্ত করা হবে।
নেকমের ব্যবস্থাপক আবদুল কাইয়ূম প্রথম আলোকে বলেন, হাজার কিলোমিটার দূরের গভীর বঙ্গোপসাগর থেকে মা কচ্ছপ ডিম পাড়তে নির্জন সৈকতে ছুটে আসে। কিন্তু সমুদ্রের যেখানে–সেখানে মাছ ধরার জাল ফেলে রাখায় কচ্ছপ উপকূলে ডিম পাড়তে আসতে পারছে না। জালে আটকা পড়ে বিপুল মা কচ্ছপের মৃত্যু হচ্ছে। জালে আটকা পড়লে অনেক জেলে কচ্ছপকে ছেড়ে না দিয়ে লাঠি দিয়ে পিঠিয়ে কিংবা আঘাত করে হত্যা করে, তারপর সাগরে নিক্ষেপ করে। পরে জোয়ারের পানিতে মরা কচ্ছপ ভেসে আসে সৈকতে। গত ডিসেম্বর মাসে টেকনাফ সৈকতে কয়েকটি মরা কচ্ছপ ভেসে এসেছিল। জালে আটকা পড়লে কচ্ছপকে যেন পিটিয়ে হত্যা করা না হয়, সে ব্যাপারেও জেলেদের সচেতন করা হচ্ছে।
আবদুল কাইয়ূম বলেন, সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হতে থাকায় কচ্ছপের ডিম পাড়ার হারও কমে যাচ্ছে। বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে কচ্ছপের ডিম পাড়া শুরু হয়। চলে মার্চ পর্যন্ত। কিন্তু গত ডিসেম্বর মাসে সেন্ট মার্টিন, সোনাদিয়া দ্বীপসহ কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার সৈকতে কচ্ছপের ডিম পাড়ার দৃশ্য চোখে পড়েনি। একটি ডিমও সংগ্রহ করা যায়নি। এই প্রথম গত বুধবার রাতে প্যাঁচারদ্বীপ সৈকতে একটি কচ্ছপ এসে ১২৫টি ডিম পেড়ে নিরাপদে ফিরে গেল।
নেকমের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২০ সালেও সমুদ্রসৈকতের বালুচর থেকে ১০ থেকে ১২ হাজার ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল। মা কচ্ছপের মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ায় এবং ডিম পাড়ার পরিবেশ না থাকায় ডিম সংগ্রহও আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। ২০২২ সালে পুরো সৈকত থেকে তাঁরা ডিম সংগ্রহ করেন মাত্র এক হাজার। চলতি মৌসুমের এক মাস অতিক্রান্ত হলেও সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ১২৫টি ডিম।
প্যাঁচারদ্বীপ সৈকতের কাছেই বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার বলেন, নেকমের মাঠকর্মী আবদুল লতিফ ১২৫টি ডিম বালুচরের গর্ত থেকে সংগ্রহ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিজেদের (নেকমের) হ্যাচারিতে সংরক্ষণ করেন। বালুর দেড়-দুই ফুট নিচে সংরক্ষণ (বালু চাপা দিয়ে রাখা) করা ১২৫টি ডিম আগামী ৩ মাস পরিচর্যা করা হবে। সংগ্রহ করা হবে বিজ্ঞানভিত্তিক নানা তথ্য–উপাত্ত। এরপর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে সেগুলো সাগরে অবমুক্ত করা হবে।
দুই-তিন দিন বয়সী বাচ্চাগুলো ফিরে যাবে হাজার মাইল দূরে তাদের মা-বাবার আবাসস্থলে—এমন মন্তব্য করে সাঈদ মাহমুদ বলেন, যদি অন্য কোনো বিপর্যয় না ঘটে, তবে এসব বাচ্চা একদিন বড় হয়ে আবার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে কোনো এক পূর্ণিমা রাতে ডিম পাড়ার জন্য এই সৈকতে ফিরে আসবে। যেখানে একদিন তার মা এসেছিল ডিম পাড়ার জন্য।
মানুষের নানা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে দিন দিন কচ্ছপের ডিম পাড়ার স্থান বিনষ্ট হচ্ছে জানিয়ে সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার বলেন, এ কারণে কচ্ছপের বিলুপ্তি ঘটছে। কচ্ছপের বিচিত্র জীবনকাল তুলে ধরে তিনি বলেন, কীভাবে একটি কচ্ছপের বাচ্চা তার মায়ের আবাসস্থল চিহ্নিত করে হাজার হাজার মাইল বিপদসংকুল উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছে, তা বিষ্ময়কর ব্যাপার। আবার প্রাপ্ত বয়সে ডিম পাড়ার সময় হলে সেই বাচ্চাগুলো কীভাবে হাজার মাইল দূর থেকে তার জন্মস্থান নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করে ঠিক সেখানেই ডিম পাড়তে আসে, তা ভাবনার বিষয়। কচ্ছপের এমন জীবনরহস্য এখনো অজানা।