
চট্টগ্রামে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কয়েকটি আসনে নতুন মুখের জয়ই সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। প্রথমবার সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েই পাঁচজন প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চারজন বিএনপির ও একজন জামায়াতে ইসলামীর। ভোটাররা বলছেন, স্থানীয় বাস্তবতা ও সম্ভাবনা বিবেচনা করেই অনেকেই এই প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর সন্ধ্যা থেকেই বেসরকারি ফলাফল আসতে শুরু করে। গতকাল রাত ও আজ শুক্রবার দুপুরে ফলাফল প্রকাশ করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
এবার চট্টগ্রাম নগর, উত্তর ও দক্ষিণ—এই তিন অঞ্চল মিলিয়ে মোট ১৬টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ১১৫ জন প্রার্থী। বিএনপির ১৬ জন, জামায়াত-সমর্থিত ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জোট থেকে ১৩ জন, এলডিপি, এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে একজন করে প্রার্থী ছিলেন। নারী প্রার্থী ছিলেন ৪ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থী ১০ জন। মোট ভোটার ছিলেন ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৫১৭ জন।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী ও নগরের আংশিক) আসনে জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. নাসির উদ্দীন পেয়েছেন ৪৬ হাজার ৫৮৯ ভোট।
এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। তাঁর পিতা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক বছর পর জনগণ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভোটাররা আমাকে জয়ী করেছেন। আমি অত্যন্ত আনন্দিত। আশা করছি, সংসদে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারব।’
এবার নগরের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর, পাহাড়তলী ও ডবলমুরিং) আসনের জয়ী প্রার্থী সাঈদ আল নোমান। প্রথমবার নির্বাচনে নেমে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৯৭৮ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী পেয়েছেন প্রায় ৭৭ হাজার ভোট। এই ফলাফল শুধু ব্যবধানের কারণে নয়; প্রচারের ধরন ও বিষয়বস্তুর কারণেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা।
তাঁরা বলছেন, বাবার রাজনৈতিক পরিচয় সাঈদ আল নোমানের সঙ্গে ছিল ঠিকই, তবে প্রচারের শুরু থেকেই তিনি অলিগলি ঘুরে মানুষের কথা শুনেছেন। পরিবেশ রক্ষা, সংস্কৃতি চর্চা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন। নগরের শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের একটি বড় অংশ এই বার্তাগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন বলেই মনে করছেন তাঁরা।
জয়ের বিষয়ে সাঈদ আল নোমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার আসনের মানুষের সঙ্গে আমি দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। এখানকার মানুষ আমাকে চেনেন ও বিশ্বাস করেন। সেই আস্থার কারণেই প্রথমবার নির্বাচন করেও আমি জয়ী হয়েছি। আমি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’
চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির হুমাম কাদের চৌধুরী। তিনি ১ লাখ ১ হাজার ৪৫ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের এ টি এম রেজাউল করিম পেয়েছেন ৪১ হাজার ৭১৯ ভোট।
সবচেয়ে টানটান লড়াই দেখা গেছে চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে। বিএনপির প্রার্থী জসীম উদ্দীন আহমেদ শুরু থেকেই বিতর্কের মুখে ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক অতীত ও দলীয় মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন ছিল, পাশাপাশি বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীও ছিলেন মাঠে। তবু শেষ পর্যন্ত তিনি জয়ী হয়েছেন ৭৬ হাজার ৪৯৩ ভোট পেয়ে। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী ওমর ফারুক পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৪৬৭ ভোট। ব্যবধান মাত্র ১ হাজার ২৬ ভোট। জসীম উদ্দীন আহমেদ এর আগে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন এবারই প্রথম।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের ফলাফল বিএনপির জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা। এখানে দলীয় প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ায় সুযোগ নিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। তিনি পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৯৬০ ভোট। এর আগে ২০১৪ সালে মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এখানে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। এই প্রার্থী ভোট পেয়েছেন ৮২ হাজার ২৩৭ ভোট। এই আসনে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও গন্ডামারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ লিয়াকত আলীও স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করেছেন। তিনি পেয়েছেন ৫৫ হাজারের বেশি ভোট। ভোটের এই বিভাজন না হলে বিএনপির ফল ভিন্ন হতে পারত; এই আলোচনা এখন রাজনৈতিক মহলে ঘুরছে।