মেঝেতে পাটি বিছানো। সার বেঁধে বসে আছে শিশুরা। সবার পরনে নীল জামা। সামনে বই-খাতা। শিক্ষক ফরিদা ইয়াছমিন তাদের পড়াচ্ছেন। গতকাল সোমবার সকালে কক্সবাজারের নাজিরারটেক শুঁটকি মহালের মধ্যম কুতুবদিয়া পাড়াতে গিয়ে দেখা গেল এ দৃশ্য।
আর পাঁচটা সাধারণ স্কুলের থেকে ভিন্ন এই শিখন স্কুল। এখানে পড়তে আসা শিশুরা একসময় শুঁটকি মহালের শ্রমিক হিসেবে কাজ করত। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কক্সবাজারের ৭০০ শুঁটকি মহালে শিশুশ্রমিকদের কাজ বন্ধ হয়। ফলে কাজের সন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে প্রায় ১০ হাজার শিশু। এই শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে ২০২২ সালে নাজিরারটেক উপকূলে ৩০টির বেশি শিখন স্কুল তৈরি করে সরকার। বর্তমানে এসব স্কুলে পড়াশোনা করছে প্রায় ১২ হাজার ৩০০ শিশু। এর মধ্যে মেয়েশিশু ৬ হাজার ৬৮৩ জন এবং ছেলেশিশু ৫ হাজার ৬১৭ জন।
কুতুবদিয়া পাড়া শিখন স্কুলের শিশু সোহেল (৯) জানায়, আগে সে মায়ের সঙ্গে শুঁটকি মহালে যেত। মাছ ধোয়ার কাজ করত। এক বছর ধরে সে মহালে যায় না। স্কুলে এসে পড়ে, ছবি আঁকে। বড় হয়ে সে চিকিৎসক হবে। দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াবে।
বর্তমানে কক্সবাজার পৌরসভায় ১০০টি, সদর উপজেলায় ৭০টি, রামুতে ৭০টি, চকরিয়ায় ৭০টিসহ জেলায় মোট ৩১০টি শিখন স্কুল রয়েছে। শিখন স্কুলের এ শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি সমাজকল্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থা স্কাস। পাঠদান কার্যক্রম ঠিকমতো চলছে কি না, তা দেখভাল করেন সংস্থার ২৫ সুপারভাইজার। শিশুদের নিয়মিত কৃমিনাশক ও আয়রন ট্যাবলেট খাওয়ানো হচ্ছে।
সংস্থাটির দেওয়া তথ্যমতে, এ কর্মসূচির আওতায় শিখন স্কুল ও শিখনকেন্দ্রে দুই ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। শিখন স্কুলে নির্দিষ্ট কারিকুলাম অনুযায়ী লেখাপড়া হচ্ছে। শিখনকেন্দ্রে পড়ানো হয় পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের। তাদের নিয়ে তিন বছর মেয়াদি প্রারম্ভিক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে।
ইউনিসেফ ও ইউনেসকোর জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য বান্দরবানে শিক্ষা ও সাক্ষরতার হার কম। এ অঞ্চলের শিশুদের স্কুলমুখী করতে সরকারের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর এ শিক্ষা প্রকল্প অত্যন্ত সময়োপযোগী। এ কথা উল্লেখ করে স্কাসের চেয়ারম্যান জেসমিন প্রেমা প্রথম আলোকে বলেন, একধরনের অন্ধকার জীবনে চলে যাওয়া শিশুদের শিখন স্কুলে পড়ানো হচ্ছে। শিখন স্কুলে শিক্ষার্থীদের অভাব দূর করতে প্রতি মাসে ১২০ টাকা করে উপবৃত্তি দেওয়া হয়।
শহরের বিজিবি ক্যাম্প এলাকার আরেকটি শিখন স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, ২৫-৩০ শিশুকে পড়াচ্ছেন শিক্ষক বুলবুল আক্তার। তিনি বলেন, সকাল ও বিকেলে সময় ভাগ করে শিশুদের পড়ানো হয়। যথাসময়ে শিশুরা স্কুলে চলে আসে। কেউ স্কুলে না এলে তার পরিবারকে জানানো হয়।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শিশুদের উপস্থিতিতে মুখর থাকছে শহরের শিখন স্কুলগুলো। শিশুরা হাতে-কলমে শিখছে ছবি আঁকা, গল্প বলা, সংগীত-সাহিত্য চর্চা ও খেলাধুলার সুযোগও পাচ্ছে। পোশাক, বই, খাতাপত্র, কলমসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র বিনা মূল্যে সরবরাহ করে স্কাস।
পৌরসভার কাউন্সিলর আকতার কামাল বলেন, নাজিরারটেক উপকূলের ১৮টি গ্রামে সরকারি খাস জমিতে মজুর শ্রেণির ৭০ হাজার মানুষের বসবাস। এর মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ শুঁটকিশ্রমিক। ১৮টি গ্রামের কোথাও সরকারি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এখন শিখন স্কুলের মাধ্যমে কয়েক হাজার শিশু লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। শিশুদের অনেকে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো কক্সবাজার জেলা সহকারী পরিচালক এ কে এম বজলুর রশীদ তালুকদার বলেন, ঝরে পড়া শিশুদের জন্য সরকার ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে এ শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। শিশুদের মধ্যে অনেকে তৃতীয় শ্রেণির পাঠ শেষ করেছে। এর মধ্যে ৩০০ শিশুকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির চেষ্টা চলছে।
প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের স্কুলগামী করতে শিখন স্কুল ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে জানিয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন বলেন, ঝরে পড়া শতভাগ শিশুদের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসতে শিখন স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রাখা জরুরি।