
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার একটি মাদ্রাসার তরুণ শিক্ষককে কক্ষের দরজা–জানালা বন্ধ করে মারধরের অভিযোগ উঠেছে আরেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। পরে শিক্ষার্থীদের সামনে ওই তরুণ শিক্ষকের শার্টের কলার ধরে টানাহেঁচড়া করা হয়েছে। এ ঘটনার একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম জাহাঙ্গীর হোসেন। আর হেনস্তা ও মারধরের শিকার তরুণ শিক্ষকের নাম খাইরুল ইসলাম। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেন নিজেকে মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা দাবি করে এর আগেও একাধিক শিক্ষককে মারধর করেছেন। সেই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ায় তিনি (জাহাঙ্গীর) কাউকে ‘পাত্তা’ দিতে চান না।
গত বুধবার ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের গোপালনগর মহিলা আলিম মাদ্রাসায়। গত বৃহস্পতিবার রাতে এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে ঘটনার দিন সন্ধ্যায় বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে বসে অভিযুক্ত শিক্ষককে মৌখিকভাবে তিরষ্কার করা হয়েছে। তবে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযুক্ত শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেন নিজেকে মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা বলে দাবি করেন। তিনি মাদ্রাসাটির এবতেদায়ির সহকারী বাংলা শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। আর ভুক্তভোগী শিক্ষক খাইরুল ইসলাম বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) অধীনে নিয়োপ্রাপ্ত হয়ে ওই মাদ্রাসায় বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তরুণ শিক্ষক খাইরুল ইসলামকে ডেকে উপবৃত্তির কাজ নিয়ে কথা বলেন জাহাঙ্গীর হোসেন। কথা–কাটাকাটিতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ উঠেছে, জাহাঙ্গীর প্রথমে খাইরুলকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। এরপর শিক্ষকদের কক্ষে নিয়ে দরজা-জানালা বন্ধ করে তাঁকে মারধর করেন।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি মূলত এ ঘটনার পরের অংশের। ৫৫ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, হামলার শিকার খাইরুল ইসলাম কান্না করছেন। এ সময় ভিডিও ধারণকারী অপর এক শিক্ষককে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি দরজা বন্ধ করে একজন শিক্ষককে পেটাবেন, এটা তো হয় না।’ অন্য শিক্ষকেরা খাইরুল ইসলামকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় জাহাঙ্গীর হোসেন তেড়ে এসে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে খাইরুল ইসলামের শার্টের কলার ধরে টানা–হেঁচড়া শুরু করেন। এ সময় খাইরুল এবং ভিডিও ধারণকারী অপর শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। পুরো ঘটনাটি ঘটে শিক্ষার্থীদের সামনে। ঘটনার সময় মহিলা মাদ্রাসার ছাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং তাঁদের চিৎকার করতে শোনা যায়।
স্থানীয় তিনজন বাসিন্দা বলেন, তিনি (জাহাঙ্গীর) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলেও বর্তমানে মাদ্রাসাটি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এটা বর্তমানে জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়। শিক্ষককে মারধরের মতো গুরুতর ঘটনা ঘটার পরও যদি কোনো বিভাগীয় তদন্ত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা আছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবেশ অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাহাঙ্গীর নিজেকে শিক্ষকের চেয়ে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বেশি পরিচয় দিয়ে থাকেন। তিনি এর আগেও ক্ষমতা দেখিয়ে একাধিক শিক্ষককে লাঞ্ছিত করেছেন।’
ভুক্তভোগী শিক্ষক খাইরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার ওপর যেভাবে হামলা চালানো হয়েছে, একজন শিক্ষক হিসেবে আমি লজ্জিত। আমি শিক্ষার্থীদের সামনে কীভাবে যাব? ঘটনার পর থেকে আমি শিক্ষার্থীদের সামনে গিয়ে কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছি। আমার ঘুম হচ্ছে না। অহেতুক আমার ওপর হামলা করা হয়েছে। আমি চাই, পৃথিবীর কোনো শিক্ষক যেন এভাবে লাঞ্ছিত না হয়। কোনো শিক্ষককে যেন এভাবে আঘাত করা না হয়। সব শিক্ষকের নিরাপত্তা চাই। আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করেছি। এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
শুক্রবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেনের মুঠোফোন কয়েকবার ফোন করে হলে নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। তবে ঘটনার পর জাহাঙ্গীর স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত। এ জন্য তিনি ভুক্তভোগী শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শুক্রবার বিকেলে মাদ্রাসাটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা শাহ আলম প্রথম আলোকে বলেন, মাদ্রাসার দুজন শিক্ষকের মধ্যে কথা–কাটাকাটির একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হলে তিনি উভয় পক্ষকে শান্ত থেকে শ্রেণি কার্যক্রম অব্যাহত রাখার এবং শ্রেণি কার্যক্রম শেষে সব শিক্ষক-কর্মচারীকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে আসার নির্দেশ দেন। পরে সন্ধ্যায় তাঁরা সেখানে যান। এ সময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পরবর্তীতে সভায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে তিরষ্কার করা হয় এবং সবইকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়। তিনি আরও বলেন, ‘এমন ঘটনা মোটেও কাম্য নয়। জাহাঙ্গীর হোসেন মাদ্রাসাটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নুরুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেনকে মৌখিকভাবে তিরষ্কার করে বৃহস্পতিবার থেকে পাঠদান স্বাভাবিক রাখতে বলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ঘটনাটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক বিষয় দেখভাল করবেন অধ্যক্ষ। ওই ব্যক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠাতা দাবি করে এভাবে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেই। এ ছাড়া পূর্বে কোনো শিক্ষক তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি। পুরো ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হবে।