
হালিমা খাতুনের স্বামী মারা গেছেন প্রায় ১২ বছর আগে। স্বামীর মৃত্যুর পর সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত বিধবা ভাতা পেতেন হালিমা। প্রতি মাসে পাওয়া ৫০০ টাকায় ওষুধপত্র ও ভালো–মন্দ কিছু কিনে খেতে পারতেন তিনি। কিন্তু ছয়-সাত মাস ধরে হালিমা ভাতা পাচ্ছেন না। খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, ‘নিরুদ্দেশ’ থাকায় তাঁর ভাতা বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ নান্দাইলের সাভার গ্রামে নিজ বাড়িতে বসবাস করছেন এই নারী।
হালিমার মতো ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতা পেতেন, এমন দেড় হাজারের বেশি উপকারভোগীর ভাতা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের যাচাই-বাছাই করার পর তাঁদের ‘নিরুদ্দেশ’ দেখানো হয়েছে। তবে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে তাঁদের কয়েকজনকে বাড়িতে গিয়ে পাওয়া গেছে।
সমাজসেবা কর্মকর্তার দাবি, যেসব মুঠোফোন নম্বরে ভাতা দেওয়া হয়, সেই নম্বরে ফোন দিয়ে অনেককে পাওয়া যায়নি। সমাজকর্মীদের মাধ্যমে তাঁদের খোঁজখবর নিয়ে ‘নিরুদ্দেশ’ দেখানো হয়েছে। অন্যরা সবাই ভাতা পাচ্ছেন। তবে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানরা বলছেন, বাদ পড়া ব্যক্তিদের সবাই ‘নিরুদ্দেশ’ নন। ভাতা বন্ধ হওয়ায় অনেকে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় মোট উপকারভোগী ৩৮ হাজার ৭৫৮ জন। তাঁদের মধ্যে বয়স্ক ভাতা ২২ হাজার ৫০৮ জন, বিধবা ভাতা ৯ হাজার ৮১৮ এবং ৬ হাজার ৪৩২ জন প্রতিবন্ধী ভাতা পান। ঠিক কতজনের ভাতা বন্ধ হয়ে গেছে, তার প্রকৃত হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে কার্যালয়সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র সংখ্যাটি দেড় হাজারের বেশি বলে জানিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে উপজেলার অন্তত ছয়টি ইউনিয়নে বাদ পড়া ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নান্দাইল ইউনিয়নে ১৩০ জন, সিংরইলে ১২৮, খারুয়ায় ১৫৭, মোয়াজ্জেমপুরে ১৬৬, মুশুলীতে ১৫৪, জাহাঙ্গীরপুরে ১৩২ জন উপকারভোগীর নাম বাদ পড়েছে।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. ইনসান আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার যেসব সিম কার্ডে ভাতা পাঠায়, আমরা সেগুলোতে একাধিকবার ফোন করেছি। ফোনে যাঁদের পাওয়া গেছে, তাঁরা নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন। যাঁদের ফোনে পাওয়া যায়নি, তাঁদের খোঁজে ইউনিয়ন সমাজকর্মীদের মাঠপর্যায়ে পাঠিয়েছি। তারপর ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সহায়তায় প্রতিটি ওয়ার্ডে দ্বিতীয়বার যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এ সময় যাঁদের পাওয়া যায়নি, তাঁদের নিরুদ্দেশ দেখানো হয়েছে। তাঁদের ভাতাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের স্থলে অন্যদের নাম প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। আমরা বিধি অনুযায়ী কাজ করেছি।’
নান্দাইল ইউনিয়নে নিরুদ্দেশ হওয়া ব্যক্তিদের খোঁজ নিতে সম্প্রতি সাভার গ্রামে যান এই প্রতিবেদক। তিনি গ্রাম ঘুরে আগে ভাতা পেতেন, এমন কয়েকজনের দেখা পান। অথচ সমাজসেবা কার্যালয়ের যাচাই-বাছাইয়ে তাঁদের নিরুদ্দেশ দেখানো হয়েছে। এমন দুই বিধবা নারী শরীফা খানম ও রাশিদা খাতুন।
শরীফা ও রাশিদা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বাড়িতে থেকে মুঠোফোনে ভাতা পাচ্ছিলেন। ছয়-সাত মাস ধরে ভাতা না আসায় সমাজসেবা কার্যালয়ে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁরা নাকি নিরুদ্দেশ ছিলেন। তাই ভাতা বাতিল করা হয়েছে। অসহায়ত্ব প্রকাশ তাঁরা বলেন, ‘আমাদের বাড়ির বাইরে যাওয়ার সামর্থ্য নেই। আমরা কখন নিরুদ্দেশ হলাম?’ সিংরইল ইউনিয়নের মোমেনা খাতুন বলেন, তিনি আগে ভাতা পেতেন। পাঁচ-ছয় মাস হলো তাঁর ভাতা বন্ধ হয়ে গেছে।
একই গ্রামে বয়স্ক ভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়া বৃদ্ধ জসীম উদ্দিন ও ছফর উদ্দিনকেও বাড়িতে পাওয়া যায়। জসীম উদ্দিন বলেন, ‘এ বয়সে শইলডা আর চলে না। তারপরও মাইনষের কাজকাম করি। তয় গ্রাম থেকে কোথাও বের হই না। তারপরও কীভাবে নিরুদ্দেশ হলাম, বুঝতে পারছি না।’ একই গ্রামের হজরত আলী বলেন, ‘পেটের দায়ে এ বৃদ্ধ বয়সে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে নৈশপ্রহরীর চাকরি করি।’ তাঁকে বাড়িতে না পেয়ে নিখোঁজ দেখানো হয়েছে। তাঁর ভাতাও বন্ধ করা হয়েছে।
নান্দাইল ইউপির চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের চিঠি পেয়ে সভা করে বাদ পড়া ব্যক্তিদের নাম রেজল্যুশনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই রেজল্যুশন সমাজসেবা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। নান্দাইল ইউনিয়নে যাঁদের ‘নিরুদ্দেশ’ দেখিয়ে ভাতা বন্ধ করা হয়েছে, তাঁদের কয়েকজনকে বাড়িতে পাওয়া গেছে। যাচাই-বাছাইয়ের দায় তিনি সমাজসেবা কার্যালয়ের ওপর চাপিয়ে দেন।
সিংরইল ইউপির চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন দু-তিনজন করে তাঁর কাছে এসে ভাতা বন্ধের কারণ জানতে চাইছেন। তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারছেন না। তিনি বলেন, ভাতাভোগীদের অনেকেই শ্রমজীবী মানুষ। কর্মসূত্রে যাচাই-বাছাইয়ের সময় হয়তো এলাকার বাইরে ছিলেন। এখন তাঁদের কী হবে, তিনি বলতে পারছেন না। জাহাঙ্গীরপুর ইউপির চেয়ারম্যান মো. কামাল উদ্দিন মণ্ডলও একই ধরনের মন্তব্য করেন।
সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. ইনসান আলী বলেন, ‘ভাতা পাওয়ার উপযোগী কেউ যদি বাদ পড়ে থাকেন, তাহলে তিনি যেন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন সমাজকর্মীর কাছে জমা দেন। আমরা তাঁদের বিষয়টা বিবেচনা করে দেখব। সবকিছু স্বচ্ছতার ভিত্তিতে করা হবে।’