
তিন দিন আগেও নদীতে মাছ ধরেছেন, চালিয়েছেন নৌকা। নিজ পায়ে স্বাভাবিক আর দশটা মানুষের মতো হাঁটাচলা করেছেন। এখন তাঁর বাঁ পায়ের একটি অংশ নেই। তা কেটে ফেলা হয়েছে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন তিনি।
এই অবস্থা কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকার যুবক মোহাম্মদ হানিফের (২৬)। গত সোমবার সকালে নাফ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে আহত হন হানিফ। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
পা হারিয়ে পঙ্গু হানিফ আর আগের মতো মাছ ধরতে নামতে পারবেন না নাফ নদীতে। তাঁর দিন কাটছে হাসপাতালের বিছানায়। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে কবে বাড়ি ফিরতে পারবেন তা–ও নিশ্চিত নয়। দরিদ্র পরিবারের উপার্জনক্ষম এই যুবক আহত হওয়ায় দিশাহারা তাঁর বাবা-মা ও স্ত্রী। হানিফ কীভাবে সামনের দিনগুলো পার করবেন, তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় কাটছে তাঁদের সময়।
ছেলেটাই ছিল সংসারের একমাত্র ভরসা। এখন সে নিজেই অসহায়। কীভাবে চলবে আমাদের পরিবার। হাসপাতাল থেকে ফিরলেও পঙ্গু ছেলেটা পাহাড় বেয়ে ঘরে কীভাবে আসা-যাওয়া করবে জানি না।ফজল করিম, হানিফের বাবা
পরিবারের সদস্যরা জানান, যে এলাকায় হানিফ মাছ ধরতে গিয়েছিলেন, সেটি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের কাছে। সীমান্তের বাংলাদেশ অংশের ওই স্থানে বাংলাদেশি জেলেরা প্রায়ই মাছ ধরতে যান। হানিফ মাছ ধরার সময় একটি স্থানে পা পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তাঁর বাঁ পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিস্ফোরণের শব্দ ও হানিফের চিৎকার শুনে আশপাশে থাকা লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে পশ্চিম লম্বার বিল এলাকায় হানিফের ঘরে গিয়ে দেখা যায়, দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের। কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের লম্বার বিল এলাকার পশ্চিমে পাহাড়ের ঢালুতে হানিফদের ছোট্ট ঘর। পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো উঁচু-নিচু পাহাড় বেয়ে ঘরে আসা-যাওয়া করতেন হানিফ। এখন সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলেও পা হারানো হানিফ কীভাবে উঁচু–নিচু পাহাড় বেয়ে ঘরে ঢুকবেন, সেই চিন্তাও ভাবিয়ে তুলছে পরিবারের সদস্যদের।
আহত মোহাম্মদ হানিফের বাবা ফজল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলেটাই ছিল সংসারের একমাত্র ভরসা। এখন সে নিজেই অসহায়। কীভাবে চলবে আমাদের পরিবার। হাসপাতাল থেকে ফিরলেও পঙ্গু ছেলেটা পাহাড় বেয়ে ঘরে কীভাবে আসা-যাওয়া করবে জানি না।’
ফজল করিমের কথা শেষ হতে না হতেই ছেলের কথা বলে বিলাপ করতে থাকেন হানিফের মা জাহানারা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার সুস্থ–সবল ছেলেটা পঙ্গু হয়ে গেল। এটি আমি নিজের চোখে কীভাবে দেখব। তার স্ত্রী-সন্তানের কী হবে। আগের মতো সে তো আর মাছ ধরতে যেতে পারবে না, পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে থাকতে হবে।’
হানিফের ঘরের সামনে জড়ো হয়ে তাঁর মা-বাবাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন প্রতিবেশীরা। প্রতিবেশী বৃদ্ধ খাইরুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, সীমান্তে এত মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা, এসবের কী শেষ নেই। আর কত মানুষ পঙ্গু হবে। পশুও রেহাই পাচ্ছে না বিস্ফোরণ থেকে। হানিফের সঙ্গে একই সময়ে জলজ্যান্ত দুটি ছাগলও বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।
হানিফের সঙ্গে হাসপাতালে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী সুফায়রা বেগম। সঙ্গে আছে একমাত্র সন্তান ওবায়দুল হক (৯)। সুফায়রা জানান, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা হানিফ এখনো মাইন বিস্ফোরণে আহত হওয়ার সেই ভয়াল মুহূর্তের কথা স্মরণ করে আঁতকে ওঠেন। পা হারা স্বামীকে দেখে তিনি নিজেও কান্না ধরে রাখতে পারেন না। সুফায়রা মুঠোফোনে বলেন, ‘আমার ছেলেটা বারবার জানতে চায় বাবার পা কোথায়, একটি পা নেই কেন, আমি তাকে কী জবাব দেব।’