বাবা মায়ের সঙ্গে আনাই মগিনি(বাম থেকে দ্বিতীয়) ও আনুচিং মগিনি(ডানে)
বাবা মায়ের সঙ্গে আনাই মগিনি(বাম থেকে দ্বিতীয়) ও আনুচিং মগিনি(ডানে)

সাফ ফুটবলজয়ী দুই বোন বললেন, ‘এখন আর কেউ খোঁজ নেয় না’

খাগড়াছড়ির দরিদ্র পরিবার থেকে ফুটবলে এসেছিলেন দুই যমজ বোন আনাই মগিনি ও আনুচিং মগিনি। সংসারে দুই বেলা খাবার জোগাড় হতো না। কিন্তু অদম্য দুই বোন থেমে থাকেননি। ২০১৬ সালে বয়সভিত্তিক ফুটবলে যোগ দেন তাঁরা। ২০২১ সালে সাফ অনূর্ধ্ব ১৯ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেছেন দুই বোনই। একমাত্র জয়সূচক গোল করেন আনাই মগিনি। অভিমান নিয়ে জাতীয় দল ছেড়েছেন দুই বোনই। আর আনাই মগিনি ফুটবলই ছেড়ে দিয়েছেন পুরোপুরি। ১০ হাজার টাকা বেতনে জেলা পরিষদের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে চাকরি করছেন তিনি। বোন আনুচিং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

খাগড়াছড়ির দুর্গম সাত ভাইয়া গ্রামের একটি ছোট ঘর। টিনের ছাউনি, মাটির উঠান—সেখানেই বড় হয়েছেন যমজ দুই বোন ফুটবলার আনাই মগিনি ও আনুচিং মগিনি। জন্মের পর থেকেই তাঁদের জীবন ছিল সংগ্রামের। বাবা রিপ্রু মগিনি ও মা আপ্রমা মগিনির অভাবের সংসারে দুই নবজাতকের খাবার জোগাড় করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

সেই কঠিন বাস্তবতাকে বদলে দেয় ফুটবল। স্থানীয় শিক্ষক বীরসেন চাকমার হাত ধরেই দুই বোনের জীবনে আসে নতুন মোড়। ছোট্ট গ্রাম থেকে শুরু হওয়া সেই পথচলা ধীরে ধীরে পৌঁছে যায় দেশের ফুটবলের বড় মঞ্চে।

২০১৬ সাল থেকে বয়সভিত্তিক দলে নিয়মিত খেলতে শুরু করেন আনাই ও আনুচিং। তাঁদের প্রতিভা আর পরিশ্রম নজর কাড়তে শুরু করে সবার। এরই ধারাবাহিকতায় আসে জীবনের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত—২০২১ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল।

ভারতের বিপক্ষে সেই ম্যাচে পুরো সময় ছিল টান টান উত্তেজনা। গোলশূন্য অবস্থায় যখন ম্যাচ শেষের পথে, ঠিক তখনই আনাই মগিনির পা থেকে আসে জয়সূচক গোল। সেই একমাত্র গোলেই বাংলাদেশ পায় ১-০ ব্যবধানে জয়, আর আনাই হয়ে ওঠেন নায়িকা।

জাতীয় দলে ডাক পেলেও পরবর্তী সময়ে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টে উপেক্ষিত হন আনাই। ২০২২ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ছোট বোন আনুচিং দলে জায়গা পেলেও আনাই থাকেন বাইরে। বারবার এমন উপেক্ষা আর সুযোগ না পাওয়ার কষ্ট জমতে থাকে তাঁর মনে। শেষ পর্যন্ত অভিমানই জয়ী হয়। মাত্র ২১ বছর বয়সে ফুটবলকে বিদায় জানান একসময়ের সম্ভাবনাময় এই ফুটবলার। আনাইয়ের পর জাতীয় দল থেকে অবসর নেন আনুচিংও।

কিন্তু সাফল্যের সেই আলো বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। জাতীয় দলে ডাক পেলেও পরবর্তী সময়ে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টে উপেক্ষিত হন আনাই। ২০২২ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ছোট বোন আনুচিং দলে জায়গা পেলেও আনাই থাকেন বাইরে। বারবার এমন উপেক্ষা আর সুযোগ না পাওয়ার কষ্ট জমতে থাকে তাঁর মনে। শেষ পর্যন্ত অভিমানই জয়ী হয়। মাত্র ২১ বছর বয়সে ফুটবলকে বিদায় জানান একসময়ের সম্ভাবনাময় এই ফুটবলার। আনাইয়ের পর জাতীয় দল থেকে অবসর নেন আনুচিংও।

সম্প্রতি কথা হয় আনাই মগিনির সঙ্গে। অনেকটা আক্ষেপ করে বলেন, ‘একসময় সবাই খোঁজ নিত। এখন কেউ খোঁজ নেয় না। অনেক কষ্ট করে চলতে হচ্ছে আমাদের।’

ট্রফি হাতে আনুচিং(বামে) ও আনাই মগিনি

ফুটবল খেলে যা আয় করেছিলেন, সেই টাকায় দুই বোন মিলে কোনোভাবে তিন কক্ষের একটি সেমি পাকা ঘর তৈরি করেছেন। বর্তমানে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদে অস্থায়ীভাবে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন। মাসে ১০ হাজার টাকার এই আয়ে চলতে হয় তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মা এবং নিজের খরচ। মাঝে মাঝে দিতে হয় ছোট বোন আনুচিংকেও।

‘আমরা দিনে এনে দিনে খাই এমন পরিবার। এখন চাকরি পেতেও টাকা লাগে। আমাদের সেই সামর্থ্য নেই।’
আনুচিং মগিনি, ফুটবলার

ফুটবল থেকে এখন পুরোপুরি দূরে আনাই। প্রায় দুই বছর ধরে মাঠে নামেন না তিনি। অন্যদিকে তাঁর যমজ বোন আনুচিং মগিনির জীবনও চলছে সংগ্রামের মধ্যেই। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ষষ্ঠ সেমিস্টারে পড়ছেন। বড় বোনের পাঠানো টাকা আর নিজের কিছু জমানো সঞ্চয়ে কোনোমতে চালিয়ে যাচ্ছেন পড়াশোনা।

বাড়ির পাশের খোলা জমিতে অনুশীলনে মগ্ন আনাই(বামে) ও আনুিচিং মগিনি

মুঠোফোনে কথা বলতে গিয়ে আনুচিং বলেন, ‘আমরা দিনে এনে দিনে খাই এমন পরিবার। এখন চাকরি পেতেও টাকা লাগে। আমাদের সেই সামর্থ্য নেই।’

খাগড়াছড়ির এই দুই বোন একসময় স্বপ্ন দেখেছিলেন ফুটবলকে ঘিরে নিজেদের জীবন গড়বেন, পরিবারের দুঃখ ঘোচাবেন। কিছুটা পথ তাঁরা এগিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে সেই স্বপ্ন আজ অনেকটাই থমকে গেছে।