
হাকালুকি হাওরে ধান ডুবে যেতে দেখে স্ট্রোক হয়েছে বর্গাচাষি বকুল দাসের (৪৫)। কয়েক দিন ধরে তিনি সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর স্ত্রী নিভা রানী দাস হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে আছেন। বাড়িতে তিন সন্তান। ভিটেমাটি না থাকা বকুল পরের জমিতে থাকেন। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে প্রায় এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এবার বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। এখন ফসল নষ্টের পাশাপাশি কিস্তির চাপও বেড়েছে।
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের হাকালুকি হাওরপারের কালনীগড় গ্রামে বকুলদের বাড়ি। একই উঠানে ১০-১২টি পরিবারের বসবাস। টিনের চালা ও বেড়ার ছোট ঘরে চার ভাই আলাদা থাকেন। প্রতিটি কক্ষেই গাদাগাদি করে পরিবারের সদস্যদের বসবাস।
গতকাল বুধবার বিকেলে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে ভেজা ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন পরিবারের সদস্যরা। এ সময় একটি বেসরকারি সংস্থার মাঠকর্মী কিস্তি আদায়ে এসে বকুলের অসুস্থতার কথা শুনে ফিরে যান।
স্বজনেরা বলেন, উপজেলা সদরের ভবানীগঞ্জ বাজারে সড়কের পাশে চায়ের দোকান করেন বকুল। সেই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হওয়ায় প্রতিবছর বর্গা জমিতে ধানের আবাদ করেন। এবার হাকালুকি হাওরের পিংলা বিলের দুগাঙ্গা এলাকায় সাত বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন। সম্প্রতি অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নামা পাহাড়ি ঢলে পাঁচ বিঘার ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। সেই দৃশ্য দেখে বাড়ি ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে তাঁকে সিলেটে নেওয়া হয়।
বকুলের বড় মেয়ে নীপা রানী দাস স্থানীয় তৈয়বুন্নেছা খানম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী। অর্থাভাবে এবার এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে পারেনি। ছেলে বিশাল দাস নবম শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে তিন্নি রানী দাস ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে।
বাবার অসুস্থ হওয়ার কথা বলতে গিয়ে নীপা বলে, ‘কয়েক দিন খুব ঝড়–বৃষ্টি আছিল। ঘর থাকি বাইর অওয়া গেছে না। এর মাঝেই খবর মিলল আওরো পানি বাড়ি গেছে। বৃষ্টির মাঝেই বাবা আওরো রওনা দিলা। সন্ধ্যার সময় বাড়িত আইয়া খুব চিন্তাত পড়লা। ধান গেল গেল কইয়া বাবায় নিজেরে আর সামলাইয়া রাখতা পারলা না। বমি করলা। এর পরে হঠাৎ বিছানাত পড়ি গেলা, মাতকথা নাই। উপজেলার সরকারি হাসপাতালে নিয়া গেলাম। ডাক্তারে পরীক্ষা করি কইলেন স্ট্রোক (মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণজনিত রোগ) অইছে। তাড়াতাড়ি সিলেটে হাসপাতালে নিতে অইব। পরে সিলেট নিয়া ভর্তি করা অইল।’
নীপা জানায়, সাত-আট দিন ধরে তাঁদের মা–বাবা সিলেটে। তাঁর কাছে হাতখরচের কিছু টাকা ছিল। তা দিয়ে দুই দিনের তেল, ডাল, মসলাপাতি কেনার পর সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। এর পর থেকে তিন ভাইবোন একই বাড়িতে কাকা রুবেল দাসের ঘরে খাবার খাচ্ছে।
নীপার কথা শেষ হতেই বিশাল বলে ওঠে, ‘বাবা সিলেট যাওয়ার পরে এই নিয়া তিন দিন কিস্তির লোক আইছেন। তাঁরারে বুঝাইয়া কইছি। সবাই ফেরত গেছইন। তিন ব্যাংকে ১ লাখ টাকার মতো ঋণ আছে বাবার। আগে বাবায় চা, ধান বেচি কিস্তি দিতা। দোকান বন্ধ, ধান পাওয়ারও আশা নাই। এখন কিস্তি কিলা দিতা। সংসার, বাবার চিকিৎসার খরচ কিলা চলত-অউ চিন্তা-উ আমরা করি। ধান তো গেছে, বাবা সুস্থ অইয়া বাড়ি আইলেই শান্তি।’
নীপা জানায়, পানি ঢোকার আগে দুই বিঘা জমির ধান কাটা হয়েছিল। কিন্তু রোদের অভাবে অনেক ধানে চারা গজিয়ে গেছে। তিন ভাইবোন মিলে সেগুলো শুকানোর চেষ্টা করছে।
পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মদনমোহন দাস বলেন, কালনীগড় ও খাকটেকা এলাকার বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র বর্গাচাষি। এবার ফসলহানিতে সবাই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষি বিভাগের তালিকায় বকুলের নামও আছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম খান বলেন, আড়াই হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুশফিকীন নূর বলেন, ‘বকুলের পরিবারের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।’